Weaver Ant, Green Ants, Genus Oecophylla

গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর।

Chowdhury family Durgapuja, Gopalpur, Patashpur

অমলেন্দু নায়েক।


পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর থানার হাট গোপালপুর গ্রামে চৌধুরী জমিদার বাড়ির দুর্গোৎসবের কথা পটাশপুর অঞ্চলে কারুরই অজানা নয়। পূজোর বয়স ৩০০ বছরের বেশি। পটাশপুরে ঐতিহ্যবাহী প্রসিদ্ধ উৎসব যা স্বতন্ত্রতা বজায় রেখে এলাকার সর্বত্র সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। পারিবারিক ঐতিহ্য ও প্রাচীন কিছু রীতিনীতিকে সম্বল করে অনুষ্ঠিত হয় চৌধুরী জমিদারির দুর্গাপূজো। তবে এখন সেই জমিদারিও নেই, তাই নেই আগেকারদিনের সেই জৌলুস।

গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর।
গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর। ছবিঃ অমলেন্দু নায়েক।
গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর।
গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর। ছবিঃ শোভনলাল মাইতি।

পট্টনায়ক পদবি থেকে পরিবর্তন হয় দাস-চৌধুরী। আনুমানিক অষ্টাদশ শতকের প্রথমভাগে চৌধুরী বংশের দ্বিতীয় পুরুষ হরিদাস পট্টনায়কের পুত্র ভগবান চৌধুরী। ভগবান চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নন্দলাল চৌধুরী জমিদারি পরিচালনা করতেন। নন্দলালের পরে, এই পরিবারে ছিল একপুরুষ বংশ। বংশ বৃদ্ধির জন্য তিনি দুর্গাপূজার ব্যবস্থা করেন। মায়ের আশীর্বাদে তাঁর তিনটি সন্তান হয় বড়ো পুত্র কৃষ্ণপ্রসাদ, মেজপুত্র কেশব প্রসাদ, ছোট পুত্র মধুসূদন।

গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর।
গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর। ছবিঃ অমলেন্দু নায়েক।

বাংলার আশ্বিন মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে সন্ধ্যায় বেলগাছের তলায় দুর্গাদেবীর বোধন, আমন্ত্রন ও অধিবাস হয়ে থাকে। চৌধুরীদের পারিবারিক পূজো শুরু থেকে আজও একই কাঠামোর দুর্গাপ্রতিমার। প্রতিবছর জন্মাষ্টমীতে প্রতিমা তৈরীর জন্য মাটি তোলা হয়। আগে পূজো হতো মাটির মন্দিরে। বাংলার ১৩৮৩ বঙ্গাব্দে পাকার দুর্গা মন্দির করা হয়। চারটি লোহার চাকা দেওয়া কাঠের পাটাতনের উপর ১৫ ফুটের একচালা মূর্তি, খাঁটি স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিতা চৌধুরীদের দুর্গা প্রতিমার অধিষ্ঠান এমনই।

গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর।
গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর। ছবিঃ শোভনলাল মাইতি।

আধুনিকতার রেশ মাত্র ছিলো না এই পুজোয়। একসময় পূজোর সানাইয়ের সুরে নহবত বসতো। মাইক বাজানো হতো না। এখন পূজোর সময় ঢাক, ঢোল, কাঁসর বাজে। মাইক বাজানো হয় মহাষ্টমীর অঞ্জলির সময়ে। অঞ্জলি দেওয়ার জন্য ভিড় জমান বহু গ্রামের মানুষ। কমপক্ষে দু'হাজার জনের বেশি মানুষ লাইনে দাঁড়ান। পূজোকে কেন্দ্র করে এলাকায় মেলা বসে ৭ দিন। থাকে হরেকরকম পশারি দোকান। মেলায় প্রতিদিন চলে মঙ্গলগান,বাউল, যাত্রা,কবিগান। পূজোর সময় নাটমন্দিরে বিদুৎ-এর আলো জ্বলতো না। মোমবাতি ও ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় পূজার্চ্চনার কাজ হতো। বর্তমানে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা করেছে চৌধুরী পরিবার। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল হোমযজ্ঞে চকমকি পাথর দিয়ে আগুন জ্বালানো হতো, এখন সূর্যের আলো থেকে লেন্সের মাধ্যমে আগুন জ্বালানো হয়। আগে ১০০ কেজি ঘি দিয়ে হোম করা হতো। এখন প্রায় ৪০ কেজি দিয়ে হোম যজ্ঞ করা হয়। হোম যজ্ঞে ব্যবহার করা হয় বেল কাঠ।

গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর।
গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর। ছবিঃ শোভনলাল মাইতি।
গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর।
গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসবে রাতে বাতাসা হরিলুট। ছবিঃ শোভনলাল মাইতি।

সপ্তমী থেকে নবমী বিতরন করা হয় খিচুড়ি প্রসাদ। সপ্তমী ও অষ্টমীতে লুচি, সুজি, পালো সহযোগে দেবী দুর্গার ভোগ নিবেদন করা হয়। চৌধুরীদের পূজোয় ভাজা ভোগ দেওয়া হয় না। সঙ্গে চৌধুরীদের কূল দেবতা রাধামাধব মন্দিরে পূজার্চনা করা হয়। পূজোর সময় প্রতি রাতে বাতাসা হরিলুটের ব্যবস্থা করা হয়। মহাষ্টমীর দিন দুর্গা দালানের নাট মন্দিরে ভিড় জমান বহু গ্রামের মানুষ। দশমীতে অরন্ধন করে আমিষ সহযোগে একত্রে খাওয়া দাওয়া করেন পরিবারের সদস্য ও আত্মীয় বন্ধু বান্ধবরা।

গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর।
গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর। ছবিঃ শোভনলাল মাইতি।

দেবীর মূর্তি বিসর্জন দেওয়া হয় গোপালপুর গ্রামের অদুরে পুরনো কেলেঘাই নদীতে। লোহার চাকা সমেত প্রতিমা কাঠামো নিয়ে শোভাযাত্রা বের করা হয়। সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন চৌধুরী পরিবারের গৃহবধূরা। বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও ঐত্যিহ্যবাহী পূজো বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন চৌধুরী পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম। সময়-সুযোগ হলে অবশ্যই গোপালপুর গ্রামে দেখতে আসুন এই পুজো। উপরিপাওনা হিসেবে দেখতে পাবেন, চৌধুরীদের কূল দেবতা রাধামাধবজীউর সুন্দর কারুকার্যময় মন্দির।

গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর।
গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর। ছবিঃ শোভনলাল মাইতি।
গোপালপুর চৌধুরীদের দুর্গোৎসব, পটাশপুর।
চৌধুরীদের কূল দেবতা রাধামাধবজীউর সুন্দর কারুকার্যময় মন্দির। ছবিঃ অমলেন্দু নায়েক।

কি ভাবে যাবেনঃ এগরা- বাজকুল রাস্তায় নতুনপুকুর বাসস্ট্যান্ডে নেমে ৩ কিমি দুরে গোপালপুর চৌধুরীদের বাড়ি। এছাড়া টেপরপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকেও যেতে পারেন। নতুনপুকুর ও টেপরপাড়া থেকে টোটো, অটো বা রিক্সা পাবেন।


midnapore.in

(Published on 19.09.2020)