কুরুমবেড়া দুর্গ | Kurumbera fort, Gaganeshwar, Keshiari

কুরুমবেড়া দুর্গ

Kurumbera fort, Gaganeshwar, Keshiari

সুদর্শন নন্দী।


খড়্গপুর স্ট্যান্ডে মিনিট পনের বসে আছি লোক্যাল বাসে । যাব কেশিয়াড়ি। বাস একবার এগোয় তো দুবার পেছোয় । হেল্পার তারস্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে আই আই টি, প্রেম বাজার, গোপালি, সালুয়া, নছিপুর, হাতিগেড়িয়া, কেশিয়াড়ি, ভসরা, নয়াগ্রাম, খড়িকা। প্যাসেঞ্জার বড়শি গিললেই পান পিকের ছররা ছিটিয়ে কন্ডাক্টর নিদান দিচ্ছে- উঠুন উঠুন, জলডি (জলদি) উঠুন, পিঠনের ( পিছনের ) ডিকে ( দিকে) ঠেসে এগিয়ে ডান (যান) । ড্রাইভার এবার কড় কড়াত শব্দে সামনের গিয়ার ফেলল। শব্দ শুনে স্তব্ধ আমি, না দৌড়তেই এই শব্দ, রাস্তায় দেহ রাখবে কিনা চিন্তায় পড়লাম। এ লাইনে গাড়ি কম। পরের গাড়ি কখন আসবে বাসেশ্বর বাবাও জানেন না।

কুরুমবেড়া দুর্গ | Kurumbera fort, Gaganeshwar, Keshiari
কুরুমবেড়া দুর্গের পথে। ছবিঃ সুদর্শন নন্দী।

পাশের বিশ বাইশ বছরের ছেলেটিও যাবে কেশিয়াড়ি। বেশ ফুরফুরে মেজাজ । সিটে আঙ্গুলে তাল ঠুকে গুনগুন করে গান গাইছে আনন্দে। সামনেই বিয়েটিয়ে হবে বোধ হয়। ভয়ে ভয়ে তাকে আমি জিজ্ঞাসা করি- হ্যা বাবা, এই যে কড়কড় শব্দ বেরোচ্ছে গাড়ির ইঞ্জিন থেকে, তা পথে আড়ি দিয়ে ঘাড় নাড়বে না তো? গান থামিয়ে ঢুলু ঢুলু চোখে সে বললে- শব্দটা না হলেই ভয় ছিল খুড়া, আমি সাত বছর এই শব্দ শুনে শুনেই যাতায়ত করছি। কখনো বিগড়োয় নি বাস। একবার শব্দ হয়নি বলে খুব টেনসেনে ছিলাম সারা রাস্তা। সরস যাত্রী। কপাল করলে এমন সঙ্গী হয় । মনের মতো উত্তর পেয়ে আনন্দে জানলাটা পিছনে ঠেলি আরও ইঞ্চি খানেক। পিছনে এক রাগি ধেড়ে বুড়ো বসে। সে দিল ইঞ্চি তিন সামনে দিকে ঠেলে। ধুত্তেরি ! যাত্রার শুরুতেই দু ইঞ্চি হাওয়া লস আমার ! তার মধ্যে খুশির খবর- গাড়ি গড়িয়েছে , মানে ছাড়ল ।

কুরুমবেড়া দুর্গ | Kurumbera fort, Gaganeshwar, Keshiari
দুর্গের সামনে সরোবর। ছবিঃ সুদর্শন নন্দী।

এতো কাছে তবু যাওয়া হয়ে ওঠেনি। অথচ বছরে সুদূরে পাঁচ-ছবার ঘুরে বেড়ানো বাঁধা রুটিন। কবিগুরু বোধ হয় এজন্য সেই ঘরের দুপা দূরের না দেখা শিশিরবিন্দুর কথা বলে গেছেন। তা এবার ছাতা, জল, ওষুধপত্র, ক্যামেরা আর পাওয়ার ব্যাংক ব্যাগে পুরেই দে দৌড়। দেখব ওড়িশার সন্নিকটে গগনেশ্বরে কুরুমবেড়া দুর্গ । নেব গ্রামবাংলার প্রকৃতির স্বাদ । ট্রেনে গেলাম খড়্গপুর। সেখান থেকে যাব বাসে করে। একা কারে করে যাওয়া আমার ধাতে নেই। কষ্ট হলেও বাসই সই। গল্পগুজব করা যায় পাঁচজনের সাথে । দেখে আনন্দ পাই কোথায় ছাগল নামছে বাস থেকে আর কোথায় হাঁস উঠছে যাত্রী সেজে। খড়গপুর থেকে ৩০ কিলোমিটার রাস্তা কেশিয়াড়ি । হিসেব মতো চল্লিশ মিনিট লাগার কথা।কিন্তু এযে লোক্যাল বাস। দাঁড়ালে নো নড়ন চড়ন। যত বেশি যায় তত বেশি দাঁড়ায়।

কুরুমবেড়া দুর্গ | Kurumbera fort, Gaganeshwar, Keshiari
কুরুমবেড়া দুর্গ। ছবিঃ সুদর্শন নন্দী।

তা যেভাবে পটাপট গিয়ার চেঞ্জ করে স্পীড তুলল ড্রাইভার, ভাবলাম এক্ষণই পৌঁছে যাব। সেগুড়ে বালি। খানিক গিয়েই ড্রাইভার পুরানোবাজার স্টপেজে কনডাক্টরকে বললে পাশের দোকান থেকে একটা রাজা নিয়ে আয়। থমকে যাই আমি। রাজা যাবে প্রজার এই লজঝড়ে বাসে ! সে ভুল ভাঙ্গল যখন কনডাক্টরকে দেখি ড্রাইভারের হাতে নীল রঙের একটা রাজা-খইনির পাউচ দিতে। গাড়ি আস্তে আস্তে ভর্তি হয়। একজন নামে তো দুজন ওঠে। আর দু-চার মিনিট ছাড়া ছাড়াই থামে। ঘণ্টা খানেকের বেশি লাগল কেশিয়াড়ি পৌঁছতে। এতক্ষণ এলাম ভাড়া নিল মাত্র কুড়ি টাকা। কারে এলে ছ-আটশ টাকা লাগত ফিরতি কিলোমিটার যোগ করে। নামলাম বাস থেকে । পাশে ডাবওয়ালা । গরমে ডাবের সাথে ভাব সবারই থাকে, বাই ডিফল্ট। তা পান করে ভাবলাম এখানকার জাগ্রত সর্বমঙ্গলা মন্দিরটি দেখে আসি। ওড়িশা শৈলীতে নির্মিত কেশিয়াড়ির এই মন্দির এখানকার দর্শনীয় স্থান। দূর দুরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন পুজো দিতে। মিনিট দশেক হাঁটা রাস্তা। সুগার একটু কমবে এই ভেবে রিক্সা না নিয়ে পা চালালাম ছাতা মেলে। একে ওকে জিজ্ঞাসা করে পৌঁছলাম মন্দিরে। দর্শন করলাম মা সর্বমঙ্গলাদেবীকে। ছোট মন্দির, সামনের চত্বর বেশ খোলামেলা। পটাপট কয়েকটা ছবি তুলে যাব গগনেশ্বর। যেজন্য বের হওয়া । মন্দির দেখে বাস স্ট্যান্ডে আসি আবার। বেলদাগামী বাসে যেতে হবে তিন কিলোমিটার দূরে কুকাই গ্রাম স্টপেজে। এসে গেল বাস। মিনির থেকে ছোট। ছোটা হাতির থেকে বড়। গোটাকয়েক আসন। খোলে ঢুকে গেলাম। একজন চেঁচালে ধীরে ধীরে জউ। মোর পায় লাগি গিলা।

কুরুমবেড়া দুর্গ | Kurumbera fort, Gaganeshwar, Keshiari
কেশিয়াড়ির সর্বমঙ্গলা মন্দির। ছবিঃ সুদর্শন নন্দী।

কথ্যভাষায় একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। স্থাপত্যের শৈলীতে যেমন ওড়িশি প্রভাব, ভাষাতেও খানিকটা। তবে যার পা থেতলে উঠলাম মনে হয় সে ৯০ ভাগ ওড়িয়া। কুকাইয়ে নেমে একজন প্রবীণকে জিজ্ঞাসা করি গগনেশ্বরের দিশা। সে বাস স্টপেজের বিপরীতের মোরাম রাস্তাটি দেখিয়ে দিল। এ রাস্তায় এখন দু তিনটি টোটো নেমেছে। তা না হলে হেঁটে যেতে হত প্রায় চার কিলোমিটার। সেখানে খড়গপুর থেকে কার না নিয়ে এসে উপায় নেই। একটা টোটো দাঁড়াল মোড়ে। চালক জিজ্ঞাসা করলে-কাই যাব। বললাম গগনেশ্বরে কুরুমবেড়া দুর্গ যাব। এককথায় রাজি। এটাও জানালাম খানিক অপেক্ষা করলে ওর টোটোতেই ফিরব। সে এবার ডবল খুশি। চলি মোরাম রাস্তা ধরে। ছেলেবেলায় এধরণের রাস্তায় আমি অভ্যস্ত। গরুর গাড়ি করে শহর থেকে ঘন জঙ্গল পেরিয়ে নিজের দেশের বাড়ি বাঁকুড়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে যেতাম । নস্টালজিয়ায় আবেশিত হয়ে পড়ি । চালক বললে এবছরই রাস্তাটা ঢালাই হবে। তখন আরও টোটো নামবে। মিনিট পনের পর পৌঁছে যাই গগনেশ্বর ।দুর্গের প্রবেশ পথের অদুরে বট গাছের নিচে দাঁড়াল টোটো। লোটাকম্বল গলায় ঝুলিয়ে নামতেই একটা ছাগল পাগল ভেবে আমাকে দেখেই তিড়িং করে দে দৌড়। চালক বললে ঘুরে আসুন, আমি দাঁড়াচ্ছি । বিশাল দেওয়াল দেখে একটু বিস্মিত হই। প্রবেশ পথে ভারতীয় পুরাতত্ব সর্বেক্ষণ-এর নোটিশ বোর্ড। দুর্গ সম্বন্ধে কোন বিবরণ নেই। আছে আইনি বিবরণ। ঢুকি ভেতরে। বাপরে ! কি বিশাল চত্বর। আন্দামানের জেলের মতো অসংখ্য সেল। ছোট ছোট কুটরি। পূর্ব প্রান্তে শিব মন্দিরের স্থান খোঁড়া । বলা ভালো ধ্বংসপ্রাপ্ত । মুসলমান শাসনে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। জানা গেল এখানে বাবা গগনেশ্বর বিরাজমান ছিলেন। অনেকের মতে বাবা কপিলেশ্বর। ওড়িশারাজ কপিলেন্দ্র দেবের নাম অনুসারে। পশ্চিম দিকে তিনটি গম্বুজ। মুসলমান শাসকদের হাতে নির্মিত উপাসনাস্থল (মসজিদ) এটি । ভিতরের চত্বর লোহার বেড়া দিয়ে ঘেরা। লম্বা করিডরটি দেখে রোমাঞ্চিত হলাম। এবার সঙ্গে আনা বই নিয়ে বসে পড়ি করিডরে।

কুরুমবেড়া দুর্গ | Kurumbera fort, Gaganeshwar, Keshiari
কুরুমবেড়া দুর্গের প্রবেশপথ। ছবিঃ সুদর্শন নন্দী।

এই দুর্গটি নির্মিত হয় ওড়িশার রাজা কপিলেন্দ্র রাজার রাজত্বকালে, ১৪৩৫ থেকে ১৪৭০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। দুর্গটির নাম কুরুমবেড়া কেন তা জানতে পারলাম না একাধিক বই ঘেঁটেও। স্থানীয় প্রবীণরা জানালেন এর নাম করমবেড়া। তা কুরুম বা করম যে বেড়াই হোক তা কেন এই নাম ? উত্তর পেলাম না। তবে এই অঞ্চলে একসময় তসরের চাষবাস হত সেকথা অনেকে জানালেন। আমরা জানি যে দ্বাদশ- ত্রয়োদশ খ্রিস্টাব্দে ওড়িশার রাজারা মেদিনীপুরের বেশির ভাগ অংশেই নিজেদের শাসন কায়েম করেছিল। আর সেই শাসন কায়েম রাখতে রাজা কপিলেন্দ্র দেবের সময় এই বিশাল দুর্গটি নির্মিত হয়ে ছিল। এটি শুধু শাসন কায়েম রাখতে সেনা ছাউনি হিসাবে নয়, পর্যটক ও পরিব্রাজকদের বিশ্রামস্থল হিসাবেও ব্যবহৃত হত। মূল স্থলটি ৩০০ ফুট দীর্ঘ এবং প্রস্থে ২২৫ ফুট। বাইরের প্রাচীরের উচ্চতা বারো ফুট।

কুরুমবেড়া দুর্গ | Kurumbera fort, Gaganeshwar, Keshiari
কুরুমবেড়া দুর্গ। ছবিঃ সুদর্শন নন্দী।

উত্তরমুখী প্রবেশ পথের সামনেই রয়েছে বিশাল দীঘি। অনেকে বলেন যজ্ঞেশ্বর কুণ্ড। সম্ভবত সেনাদের জলের চাহিদা মেটাতে এটি খনন করা হয়। পাঠান মোঘল যুদ্ধের সময় কখনো মুঘলদের আবার কখনো এটি পাঠানদের হস্তগত হয় এই ঐতিহাসিক দুর্গটি। আর মুসলমান শাসনকালেই ভেতরের শিবমন্দিরটি ভেঙ্গে ফেলা হয় । তবে শুধু পাঠান মুঘলরাই নয়,পরবর্তীকালে মারাঠা দস্যুরা যে হামলা চালিয়ে ছিল এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তখন তারাও এই দুর্গটির দখল নেয়। পাঠান, মুঘল বা মারাঠা সেনারা এটিকে সেনা ছাউনি হিসাবে ব্যবহার করতেন। যাইহোক শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করে যে দুর্গের নির্মাণ তা শেষ হয় তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ এবং শিব মন্দির ধ্বংসের মাধ্যমে। আগের শিলালিপি থেকে জানা যায় মসজিদ নির্মিত হয়েছিল ১৬৯১ খ্রিস্টাব্দে, ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে । দুর্গের ভেতরের বিশাল চত্বরটি সবুজ ঘাসে মোড়া। ভেতরে ৬৩ টি ছোট ছোট কক্ষ রয়েছে, প্রতিটি প্রায় আট ফুট চওড়া। সারা চত্বরটি ঘুরলাম আধঘণ্টা। এরমধ্যে দুবার হর্নের আওয়াজ এসেছে টোটো থেকে। বেরিয়ে একঝলক দেখে নিই বিশাল দীঘিটি। টলটল করছে টইটম্বুর জল। একঝাঁক হাঁস দেখি ঘাটে মিটিংয়ে ব্যস্ত। এবার ফেরার পালা। ফেরার আগে ভাবলাম এই বিশাল একটি দুর্গ এ জায়গায় রয়েছে এবং তাও আবার পুরাতত্ব বিভাগের অধীনে তা আমার মতো অনেকেরই তো অজানা । পৌঁছে গেলাম কুকাই স্টপেজে। এখান থেকে যাব কেশিয়াড়ি বাস স্ট্যান্ড। সেখান থেকে সোজা খড়গপুর, যেমন এসেছিলাম তার উল্টো পথ।

কুরুমবেড়া দুর্গ | Kurumbera fort, Gaganeshwar, Keshiari
শিব মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। ছবিঃ সুদর্শন নন্দী।

কীভাবে যাবেনঃ

কলকাতা থেকে খড়গপুর যেতে হবে ট্রেনে । সকালের দিকে হাওড়া থেকে ধৌলি সুপারফাস্ট, বারবিল জনশতাব্দী , ইস্পাত সুপারফাস্ট রয়েছে। শালিমার থেকে রাজ্যরাণী ( শুক্র, শনি,সোম) সাড়ে ছটায়, আরণ্যক সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস ( রবি বাদে ) সাতটা পঁয়তাল্লিশে। এই দুটি ট্রেন সাঁতরাগাছি এসেও ধরতে পারেন। আলাদা করে সাঁতরাগাছি থেকে রয়েছে রূপসী বাংলা সুপারফাস্ট সকাল ছটা পঁচিশে। ১১৬ কিলোমিটার , পৌনে দুঘণ্টার রাস্তা। খড়গপুর থেকে গগনেশ্বর কারে গেলে হাজার টাকার মধ্যে হয়ে যাবে। নইলে বাসে কেশিয়াড়ি ( ৩০ কিলোমিটার ) , সেখান থেকে বাসে কুকাই (তিন কিলোমিটার) , আর কুকাই থেকে টোটো ( চার কিলোমিটার)। ফেরার সময় বিকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে খড়গপুর থেকে উপরের ট্রেনগুলি পেয়ে যাবেন। ওগুলি না পেলেও রয়েছে পনের- বিশ মিনিট ছাড়া দুরপাল্লার ফিরতি ট্রেন। চারচাকায় গেলে ছ নম্বর জাতীয় সড়ক ( মুম্বাই রোড) ধরে খড়গপুর তারপর উপরে বর্ণিত পথ।

কুরুমবেড়া দুর্গ | Kurumbera fort, Gaganeshwar, Keshiari
কুরুমবেড়া দুর্গ। ছবিঃ সুদর্শন নন্দী।
কুরুমবেড়া দুর্গ | Kurumbera fort, Gaganeshwar, Keshiari
কুরুমবেড়া দুর্গ। ছবিঃ সুদর্শন নন্দী।

কখন যাবেনঃ

সারা বছর যাওয়া যেতে পারে। গরম ও বর্ষায় ছাতা শুধু বাড়তি নিতে হবে।


midnapore.in

(Published on 20.09.2020)