শহীদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু  | शहीद सत्येन्द्रनाथ बोसु | Saheed Satyendranath Bosu

শহীদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু

शहीद सत्येन्द्रनाथ बोसु | Saheed Satyendranath Bosu

অরিন্দম ভৌমিক।


(৩০ জুলাই ১৮৮২ - ২১ নভেম্বর ১৯০৮)


৩০ জুলাই ১৮৮২ সালে মেদিনীপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ক্ষুদিরামের গুরু নামে পরিচিত সত্যেন্দ্রনাথ মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক অভয়চরণ বসুর পুত্র এবং প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক বিখ্যাত মনীষী ও জাতীয়তাবাদের প্রচারক ঋষি রাজনারায়ণের ভ্রাতুষ্পুত্র। কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স (১৮৯৭), মেদিনীপুর কলেজ থেকে এফ.এ. (১৮৯৯) পাশ করেন। কলকাতার সি.টি. কলেজে বি.এ. পড়লেও দীর্ঘ অসুস্থতার (হাঁপানি) জন্য পরীক্ষা দিতে পারেন নি। মেদিনীপুর ফিরে এসে কালেকটরেট-এ সরকারী চাকুরী গ্রহণ করেন এবং হেমচন্দ্র কানুনগো ও অগ্রজ জ্ঞানেন্দ্রনাথের গড়া (১৯০২) গুপ্ত সমিতির সঙ্গে যুক্ত হন। অরবিন্দের নির্দেশে কলকাতার অনুশীলন সমিতি থেকে সতীশ বসু মেদিনীপুর এসে তাঁকে বক্সিং লাঠিখেলা সহ সামরিক শিক্ষাদান করেন। মেদিনীপুরে সিস্টার নিবেদিতার উপস্থিতিতে এই গুপ্ত সমিতির উদ্বোধনে তিনিই ছিলেন প্রধান উদ্যোক্তা। ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গ প্রতিবাদে সারা বাংলার সঙ্গে মেদিনীপুর উত্তাল হলে 'বেলী হলে' বিশাল ছাত্র সমাবেশ থেকে সতেন্দ্রনাথ এক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলেন এবং 'বিলেতী বর্জন - স্বদেশী গ্রহণ'-এর আদর্শে "ছাত্র ভাণ্ডার" স্থাপন করেন। ১৯০৬-এ পুরাতন জেলখানা প্রাঙ্গণে আয়োজিত কৃষি শিল্প প্রদর্শনীর স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী পরিচালনায় তিনি ছিলেন ভাইস ক্যাপ্টেন এবং তাঁরই পরামর্শে ক্ষুদিরাম ঐ মেলায় “সোনার বাংলা", "No Compromise" প্রভৃতি রাজদ্রোহ-মুলক প্রচারপত্র বিলি করে গ্রেপ্তার হন। প্রত্যুৎপন্নমতি সত্যেন কনস্টেবলকে বলেন - "ও ডেপুটিকা লেড়কা হ্যায়, উসকো কিউ পাকড়া", সেই শুনে পুলিশ ভয়ে ক্ষুদিরামকে ছেড়ে দেয়। পরে পুলিশ তাদের ভূল বুঝতে পারে এবং ক্ষুদিরামের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের মামলা করে। উক্ত ঘটনায় সত্যেন সরকারী চাকুরী হারায়। এ সময় হেমচন্দ্র বোমা তৈরী শিখতে বিদেশে পাড়ি দিলে জেলার সংগঠনের দায়িত্ব পড়ে সত্যেনের উপর। ১৯০৭-এর ৭ই ডিসেম্বর মেদিনীপুর শহরে আয়োজিত রাজনৈতিক আন্দোলনের সমাবেশে চরমপন্থী অরবিন্দ, শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী, ললিতমোহন ঘোষেদের পাশে থেকে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর ক্যাপ্টেন সত্যেন্দ্রনাথ ও তার সংগঠন নরমপন্থীদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে চরমপন্থী - নরমপন্থী বিভাজন স্পষ্ট করে তোলেন, যার ছায়া পড়েছিল সুরাট কংগ্রেসে।

শহীদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু  | शहीद सत्येन्द्रनाथ बोसु | Saheed Satyendranath Bosu
অগ্নিযুগের অস্ত্রগুরু হেমচন্দ্র কানুনগো এই ছবিটি এঁকে সত্যেন্দ্রর মাকে দিয়েছিলেন। ছবির নিচে লিখেছিলেন - "মায়ের শ্রীচরণে, হেমচন্দ্র, ৪.৫.২৪"

সত্যেন্দ্রনাথ বেছে বেছে উপযুক্ত তরুণদের গুপ্তসমিতিভুক্ত করতেন এবং তাঁদের বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত করে বিভিন্ন ভাবে শিক্ষা দিতেন। তিনি এতটাই সাবধানতার সঙ্গে কাজ করতেন যে এক শাখার সদস্য অন্য দলের সদস্যকে চিনতো না। অরবিন্দের ভবানী মন্দিরের অনুকরণে সত্যেন নিজের বাড়ির কাছে একটি ঘরে কালীমূর্তি স্থাপন করেছিলেন। এই মূর্তির সামনেই নতুন সদস্যদের দীক্ষা দেওয়া হত।

বারীন্দ্র তাঁর বিবৃতিতে বলেন - "...... শ্রী অরবিন্দ সহ দ্বিতীয় অভিযান মেদিনীপুরে। আমার দুই মামা জ্ঞানেন্দ্রনাথ ও সত্যেন্দ্রনাথ ইতিমধ্যেই সেখানে তরুণ দলকে দিয়ে একটি গুপ্ত সমিতি গড়ে ফেলেছেন; এইখানে প্রথম পরিচিত হলাম সত্যেনবাবু, নিরাপদ রায়, হেমচন্দ্র কানুনগো প্রভৃতি বহু পৌঢ় ও তরুণ কর্মীর সঙ্গে। মেদিনীপুরের "আনন্দমঠ" ছিল একটি একতলা ছোট এঁদোপাড়া শ্রীহীন বাড়িতে। দেখলাম ছেঁড়া মাদুরের উপরে ছেলেরা শোয়; তারই পাশে একটি তিনহাত উঁচু ধুলা মাখা মৃন্ময়ী কালী প্রতিমা, অযত্ন প্রদত্ত গুটিকয়েক আধশুকনো জবার নৈবেদ্য। ..... ছেঁড়া মাদুরে শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার মত ইংরাজের সাম্রাজ্য উল্টে ফেলার শুভ কাজ চলছে।"

বারীন্দ্র আরও বলেন,- "সত্যেনবাবু ছিল শীর্ণকায় উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছেলে - দুরন্ত হাঁপানি রোগে রুগ্ন, মুখে বুদ্ধির সতেজ দীপ্ত, রোগা শরীরে অফুরন্ত কর্মচাঞ্চল্য। এই ছোট্ট দলের দলপতি হয়ে চরকির পাকের মত সে ছেলের পর ছেলের মাথায় বিপ্লবী আইডিয়ার ঘুণ ধরিয়ে ঘুরে বেড়াত। "

৩০ এপ্রিল, ১৯০৮, কিংসফোর্ট হত্যার চেষ্টায় মুজাফ্ফরপুরে বোমা বিস্ফোরণের পরে ইংরেজ পুলিশ কলকাতা সহ বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপ্লবীদের গ্রেপ্তার করে। সতেন্দ্রনাথকে ধরা হল মেদিনীপুরে তাঁর দাদার বাড়ী খানাতল্লাস করে। তার আগে তিনি অস্ত্র আইনে দুমাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে ছিলেন। তাঁর দাদার নামে লাইসেন্স নেওয়া বন্ধুক তিনি ব্যবহার করেছিলেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল।

আলিপুর বোমার মামলাতে দায়রা বিচারে ৩৬ জন আসামী ছিলেন। ২৪ পরগণা জেলা মেজিস্ট্রেট বার্লি প্রাথমিক বিচারের পর ৩৬ জনকে দায়রা সোপর্দ করেন। ১৯০৮ সালের ১৯ শে অক্টোবর দায়রা জজ বীচ ক্রফেটরের আদালতে মামলা আরম্ভ হয়। মেজিস্ট্রেটের কোর্টে মামলা আরম্ভ হলে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ৪ মে স্বেচ্ছায় যে স্বীকারোক্তি করেন এবং সন্ত্রাসবাদীদের ইতিহাস, কার্যপ্রণালী ও প্রধান ঘটনাবলী বিবৃত করেন তাতে নরেন গোঁসাইকে দলের কর্মী হিসাবে নাম করায় নরেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যান্য আসামীদের সঙ্গে নরেনও আলিপুর জেলে ছিল কিন্তু কিছুদিন পরেই তার প্রতি বিপ্লবীদের মনে সন্দেহ দেখা দেয়। কারণ পুলিশ মাঝেমধ্যেই নরেনকে অফিসে ডেকে নিয়ে যেত এবং নরেন সবাইকে অন্যান্য বিপ্লবীদের সম্পর্কে বিশেষ করে বাংলার বাইরের বিপ্লবীদের সম্পর্কে জানতে চাইতো। সবার সন্দেহের অবসান ঘটিয়ে ২৩শে জুন গভর্নমেন্ট তাঁর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করে এবং নরেন চার দিন ধরে সমস্ত কাহিনী এবং অরবিন্দের সক্রিয় অংশগ্রহণ সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ দেয়। এর পর থেকে নরেনকে অন্যান্য আসামীদের সঙ্গে না রেখে ইউরোপীয় আসামীদের সঙ্গে রাখা হয়।

শহীদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু  | शहीद सत्येन्द्रनाथ बोसु | Saheed Satyendranath Bosu
২১ নভেম্বর শহীদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু'র বলিদান দিবসে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন মিডনাপুর-ডট-ইন -এর সদস্যরা (গোলকুয়ার চক, মেদিনীপুর)।

অরবিন্দের বিরুদ্ধে পুলিশ বেশি প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারেনি। অরবিন্দকে বাঁচানোর জন্য বারীন্দ্র তাঁর স্বীকারোক্তিতে অরবিন্দের নাম একবারও নেননি। বারীন্দ্রের স্বীকারুক্তির ফলেই নরেনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। সম্ভবত তার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই পুলিশের প্ররোচনায় নরেন অরবিন্দের বিরুদ্ধে অনেক কিছু বলে। সমস্ত বিপ্লবীরা অরবিন্দের বিপদে চিন্তিত হয়ে পড়েন। কিন্তু একটা শেষ আশা ছিল। আইন অনুযায়ী আসামী পক্ষ নরেনকে আদালতে জেরা না করা পর্যন্ত তাঁর উক্তি সাক্ষ্য বলে গ্রহণ করা যাবে না। সত্যেন্দ্র ঠিক করলেন সাক্ষ্য গ্রহণের আগেই নরেনকে সরিয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু নরেন খুব বলিষ্ঠ জোয়ান ছিল এবং তার সঙ্গে শরীর রক্ষক দুই জন ইউরেশিয় কয়েদী Warder থাকত।

সত্যেন অতি সুকৌশলে নরেনের হত্যার পরিকল্পনা করেন। সত্যেন আদালতে অনুপস্থিত থেকে হাঁপানির অসুস্থতার বাহানা করে হাসপাতালে যান। পরে খুব অসুস্থতার অভিনয় করলে তাঁকে ২৭ শে আগষ্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদিকে কানাই পেটে হঠাৎ প্রচণ্ড ব্যাথার অভিনয় করে হাসপাতালে ভর্তি হয়। হাসপাতালে সত্যেন বলেন যে তিনি বিপ্লবী কাজের জন্য অনুতপ্ত এবং নরেনের সঙ্গে দেখা করতে চান। নরেন সত্যেনের সঙ্গে দুবার দেখা করার পরে সত্যেন আভাস দেন যে তিনিও স্বীকারোক্তি দিতে চান। কথা অনুযায়ী ১ সেপ্টেম্বর আবার নরেনের সঙ্গে দেখার ব্যবস্থা হয়।

হেমচন্দ্র কানুনগো তাঁর "বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা" বইতে লিখেছেন - "নরেন গোসাঁই মিঃ বার্লির কোর্টে যে সাক্ষ্য দিয়েছিল, ঐ সাক্ষ্য দেওয়ার পর মিঃ বার্লি নরেনকে জেরা করিতে দেন নাই। এবং তাহার পর নরেনকে হত্যা করা হয়। .... আমাদের পক্ষের উকিল অনেক সাধ্য সাধনায় এই মর্মে একখানি দরখাস্ত মঞ্জুর করিয়াছিলেন যে যেহেতু সাক্ষীকে জেরা করতে দেওয়া হল না সেই হেতু তার উক্তি তাবৎ প্রমাণ বলে গ্রাহ্য হবে না যাবৎ না যথারীতি সেশন আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া ও জেরা হয়। এই মঞ্জুরি না নিলে গোঁসাইকে মারা প্রায় বৃথা হত - অরবিন্দবাবুর মুক্তিও নাকি অসম্ভব হত। তখন বার্লি সাহেবের কোর্টে কোন উকিলই এর অবশ্যকতা বা উদ্দেশ্য বুঝতে পারেননি তাই রাজি হন নাই। এ ফন্দীও সত্যেনের উদ্ভাবিত এবং তারই চেষ্টায় হয়েছিল। "

নরেন হত্যার ঘটনা সম্বন্ধে হেমচন্দ্র লিখেছেন - "পরদিন ১ সেপ্টেম্বর সোমবার সকালে নরেন অন্য দিনের মত তার শরীর রক্ষক দুই জন ইউরেশিয় কয়েদী Warder সঙ্গে করে হাসপাতালের দোতলার সিঁড়ির পাশে ডিস্পেন্সারিতে গিয়ে সত্যেনের সামনে বসে ছিল। রিভলবারটা যাতে সহজে কেউ কেড়ে নিতে না পারে সেজন্য নাকি সত্যেনের কোমরে দড়ি দিয়ে সেটা বাঁধা ছিল। সত্যেন জামার ভিতর থেকেই নরেনকে তাক করে মারে। খট করে শব্দ হল। কিন্তু কার্তুজ আগুন দিলে না। সত্যেন পর মুহূর্তে জামার ভিতর থেকে রিভলবার বের করে আবার নরেনকে তাক করে। তখন হিগেনবোথাম নামক একজন ইউরেশিয়ান কয়েদী Warder রিভলবারটা ধরে টানাটানি করতে আওয়াজ হয়ে তার হাতের কব্জি ভেঙ্গে যায়। কাজেই সে রিভলবার ছেড়ে দেয়। ইত্যবসরে গোসাঁই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তেই কানাই গুলি চালায়। কানাই দাঁত মাজার ভান করে ডিস্পেন্সারিতে সিঁড়ির সামনে পায়চারি করছিল। যাই হোক গুলি সামান্য ভাবে পায়ের কোন স্থানে লেগেছিল। তাই সিঁড়ি নেমে হাসপাতালের ফটক পার হয়ে দুপাশে দেওয়াল এমন একটা লম্বা সরু গলির ভেতর পড়েছিল। কানাইও পেছনে তাড়া করেছিল। সত্যেন ডিস্পেন্সারি থেকে বেরিয়ে সামনে একজন কয়েদী দেখে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল - "নরেন কোথায় গেল?" আঙ্গুল দিয়ে ইসারায় সে দেখিয়ে দিল সত্যেন ছুটে গিয়ে কানাই এর সঙ্গে যোগ দেয়। দুই জনেই গুলি চালাতে থাকে। সত্যেনের একটা গুলিতে কানাই-এর গায়ের চামড়া ছোলা হয়ে গেছিল। এতে বোঝা যায় সত্যেন যখন সেখানে যায় তখনও নরেন জমি ধরেনি। নরেন নাকি দুই একবার পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। সে খুব বলিষ্ঠ জোয়ান ছিল। তাহার পর যথারীতি "পাগলাঘণ্টি" ভোম্বা, কর্মচারীদের ছুটাছুটি, দৌড়াদৌড়ি ......."

শহীদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু  | शहीद सत्येन्द्रनाथ बोसु | Saheed Satyendranath Bosu
শহীদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু | शहीद सत्येन्द्रनाथ बोसु | Saheed Satyendranath Bosu (ডান দিকের মূর্তিটি তাঁর অগ্রজ জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু'র)

বারীন্দ্র লিখেছিলেন - "এদিকে সত্যেন পকেটে হাত রাখিয়া কথা কহিতে কহিতে পকেটেই পিস্তল সহী করিয়া নরেনকে লক্ষ করিয়া গুলি ছুঁড়িলো। গুলি নরেনের উরুতে লাগিয়া মাংস ভেদ করিয়া বাহির হইয়া গেল। ইউরেশিয়ান কয়েদী সত্যেনকে ধরিতে গিয়া পিস্তলের ঘায়ে আঙ্গুল ভাঙ্গিয়া পিছাইয়া পড়িল। নরেন্দ্র ছিল কুস্তিগির, বেশ পালোয়ান। পৃষ্ঠে গুলি খাইয়া সে হাসপাতাল ছাড়িয়া দৌড় দিল, খোলসা পথ পাইয়া কানাই তাড়া করিতে করিতে নরেনের পিঠ লক্ষ করিয়া গুলি করিল। গুলি শিরদাড়া ভেদ কোরিয়া বুকে বসিয়া গেল। ফলে নরেন তখনই মরিয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িল।"

১৯০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই রোমহর্ষক ঘটনা সমস্ত ভারতে একটি গুরুতর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। নরেনকে না মারলে সেদিন সারা বাংলায় যতটুকু বিপ্লব বেঁচে ছিল, তাও থাকত না। বিশ্বাসঘাতক, রাজসাক্ষীর হত্যার পরে বাংলার বহু জায়গায় মিষ্টিমুখ হয়। কিন্তু বারীন্দ্র এই ঘটনাকে স্বাগত জানাতে পারেননি। এই প্রসঙ্গে একটি বহু বিতর্কিত প্রশ্ন - সত্যেন ও কানাই কোথা থেকে বন্ধুক সংগ্রহ করেছিলেন ? এ সম্বন্ধে শ্রীনলিনীকান্ত বলেছেন - "জেলের মধ্যে পিস্তল আমদানি করা হল কি রকমে তা নিয়ে অনেক রকম জল্পনা কল্পনা করা হয়েছিল ; বিস্কুটের বাক্সের ভিতরে, মাছের পেটে বা কাঁঠালের নাড়ি ভুঁড়ির মধ্যে, কত কি ! এখন আমি বলি কি রকমে পিস্তলটি এসেছিল। .......

পুলিশ যখন দেখল যে আমরা যখন এত ভয়ঙ্কর হিংস্র জানোয়ার কিছুই নই তখন আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা করবার সুযোগ দিত। একটা ঘরের মাঝখানে একটা গরাদের বেড়া তুলে দেওয়া হয়েছিল - একদিকে দাঁড়াত অভ্যাগতরা, অন্য দিকে দাঁড়াতাম আমরা। শাস্ত্রী এপাশে ওপাশে থাকত বটে, কিন্তু বিশেষ কিছু নজর করত না। গায়ে আলোয়ান বা মোটা চাদর জড়িয়ে রেলিংয়ের ভিতর দিয়েই বেশ ছোঁয়াছুঁয়ি চলতে পারে। এইভাবে গারোদের ভিতর কানাই ও সত্যেনের রিভলবার দুটি হস্তান্তরিত হয়।"

নরেন গোঁসাইয়ের হত্যার অপরাধে সত্যেন ও কানাইয়ের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধি আইনের ৩০২/১১৪ ধারা মতে অভিযোগ আনা হয়। আলিপুর সেশন জজ মিঃ এফ. আর. রো-র এজলাসে কানাই বললেন খুনের জন্য তিনি একাই দায়ী। সত্যেন একই কথা বললেন যে এই খুনের জন্য তিনি একাই দায়ী। বিচারের সময় কানাইকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল - তুমি কোথা থেকে বন্ধুক পেয়েছিলে ... কে তোমাকে রিভলবার দিয়েছিল ? উত্তরে কানাই বলেন - "ক্ষুদিরাম বসুর ভূত আমাকে এই রিভলভর দিয়ে গেছে স্যার"। বিচারে দুজনেরই ফাঁসির হুকুম হল। নানা কারণে সত্যেনের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল হয়। কানাইয়ের মৃত্যু দণ্ডের বিরুদ্ধে কোন আপিল হয়নি। "There shall be no appeal" কানাইলালের এই ঐতিহাসিক উক্তি স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। কানাইয়ের ফাঁসি হয় ১০ নভেম্বর। কেওড়াতলা শ্মশানে দাহকার্যের পর কানাইলালের ‘চিতাভস্ম’ কেনার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গেছিল।

শহীদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু  | शहीद सत्येन्द्रनाथ बोसु | Saheed Satyendranath Bosu
'মিডনাপুর-ডট-ইন' -এর পক্ষ থেকে মাল্যদান করেন শহীদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু'র ভ্রাতুষ্পুত্রবধূ শ্রীমত্যা অনিতা বসু।

সত্যেন্দ্রর মৃত্যুদন্ড শেষ পর্যন্ত বহাল থাকে। ফাঁসীর আগে সত্যেন্দ্রর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেয়েছিলেন তাঁর ভগ্নী সুরবালা। সত্যেন তাঁর বিধবা মায়ের জন্য ক্ষণকাল সামান্য মাত্র বিচলিত হয়েছিলেন এবং মার জন্য সান্ত্বনা জানিয়ে বলেছিলেন যে ভাই আমেরিকাতে আছে মা তাকে ইচ্ছা করলেই দেখতে পান না, মাকে বলো আমিও তেমনি এক দূর দেশে যাচ্ছি এইমাত্র - আমার দেহকেই তিনি চোখের সামনে দেখতে পাবেন না কিন্তু আমার আত্মা তাঁকে ঘিরে থাকবে। তার তো মৃত্যু নাই।

সত্যেন্দ্রনাথের ইচ্ছাক্রমে আচার্য্য শিবনাথ শাস্ত্রী এসে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। শাস্ত্রী মহাশয়কে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন - "কিভাবে পরম শান্তিতে এই মরদেহ ত্যাগ করিব ?" শাস্ত্রী মহাশয় বলেছিলেন - "তোমার মহান ও পরম ধার্মিক পিতা ও জেষ্ঠতাতের কথা স্মরণ কর। তুমি তাঁহাদের নিকট পরম শান্তিধামে যাইতেছ। জাগতিক সমস্ত চিন্তা ত্যাগ কর। সমস্ত আসক্তি বিসর্জন দাও। ......"


২১ নভেম্বর শহীদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু'র বলিদান দিবসে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন মিডনাপুর-ডট-ইন -এর সদস্যরা (গোলকুয়ার চক, মেদিনীপুর)।

২১ শে নভেম্বর সত্যেনের ফাঁসি হয়। সত্যেনের ফাঁসী সম্পর্কে হেমচন্দ্রের এক বন্ধু কে. সি. রায় লিখে পাঠান - "ফাঁসির দিন অতি প্রত্যুষে আমরা আলিপুর জেল ফটকে উপস্থিত হইলাম। আমরা ঐ নির্দয় ব্যাপার দেখিতে প্রস্তুত ছিলাম না। উহা সমাপ্ত হইলে একজন বর্ম পরিহিত শ্বেত পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট আমার সমপবর্তী হইয়া বলিলেন "You can go now. The thing is over. Satyendra died bravely. Kanai was brave but it seems Satyendra was braver." আপনারা এখন যেতে পারেন। ব্যাপার শেষ হয়ে গেছে। সত্যেন সাহসের সঙ্গে মৃত্যু বরণ করেছেন। কানাই সাহসী ছিলেন কিন্তু আমার মনে হয় সত্যেন্দ্র ছিলেন অধিকতর সাহসী।" তদ্দণ্ডেই একজন সার্জেন্ট বলিতে লাগিল -"When I went to his cell to get him to the gallows, he was wide awake. When I said “Be ready” he answered “Well, I am quite ready” and smiled. He walked steadily to the gallows. He mounted it bravely and bore it cheerfully.” আমি যখন তাঁর ফাঁসির উদ্যেস্যে তাঁর সেলে আনতে যাই, তিনি পূর্ণ জাগ্রত ছিলেন। আমি "প্রস্তুত হন" বলতেই তিনি বলে উঠলেন "আমি সম্পূর্ণ প্রস্তুত।" তাঁর মুখে তখন মৃদু হাসি। তিনি অকম্পিত পদে ফাঁসির মঞ্চ পর্যন্ত গেলেন এবং অকুতোভয়ে মঞ্চে আরোহন করে সানন্দে ফাঁসির রজ্জু পরলেন।

শহীদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু  | शहीद सत्येन्द्रनाथ बोसु | Saheed Satyendranath Bosu
এই প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল আনন্দবাজার পত্রিকায় (২৪ নভেম্বর ২০১৯)।

পুলিশ ভয়ে সত্যেন্দ্রনাথের শবদেহ জেলের বাইরে আনে নি। জেলখানার উঁচু পাঁচিলের ঘেরাটোপের মধ্যেই চন্দনকাঠ ও ফুল দিয়ে দাহ করা হয়। এমনকি হেমচন্দ্র কানুনগো চেষ্টা করেও কোন স্মৃতিচিহ্ন পর্যন্ত আনতে পারেননি। মেদিনীপুরের বিপ্লবী সংগঠেনের প্রাণস্বরূপ শহীদ ক্ষুদিরামের গুরু শহীদ সত্যেন্দ্রনাথ অমর কীর্তির অধিকারী হয়ে ইহলোক ত্যাগ করে গেলেন।


অরিন্দম ভৌমিক।

midnapore.in

(Published on 21.11.2020 / এই প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল আনন্দবাজার পত্রিকায়, ২৪ নভেম্বর ২০১৯। )