মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি।
“উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,
ভয় নাই, ওরে ভয় নাই-
নি:শেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।”
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের এই অভয়বাণীকে আত্মস্থ করে যিনি দুর্মর স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, যাঁর জীবনের মূল্যবান অনেকটা সময় কেটেছে আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলে, সর্বস্ব ত্যাগ করে সাম্যবাদ ও মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠায় যিনি আমৃত্যু নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন, যা কিছু অন্যায়, অসত্য, অসুন্দরের বিরুদ্ধে যিনি ছিলেন খড়্গহস্ত, দরিদ্র-নিপীড়িত-মেহনতি জনগণের যিনি ছিলেন অকৃত্রিম বন্ধু, অনন্য শিক্ষক – তিনি আর কেউ নন। তিনি হলেন গড়বেতার গর্ব, সকলের প্রিয় অবিসংবাদী স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং মানবপ্রেমিক সরোজ রায়।
১৯০৯ সালের ১২ মার্চ, আসামের তেজপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন সরোজ রায়। পিতা শশীভূষণ রায়, মাতা চারুবালা দেবী। শশীভূষণ রায় তেজপুরে বনদপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিক চিয়েল্ন। সেখানকারই এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরোজ রায়ের শিক্ষার প্রথম পাঠ শুরু। এরপর পিতা শশীভূষণ রায় অবসর গ্রহণ করলে তাঁর সঙ্গে সরোজ রায়ও চলে আসেন অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার গড়বেতাতে। এখানেই গড়বেতা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হন তিনি। তারপর জর্জ টেলিগ্রাফের প্রতিষ্ঠান থেকে ওয়ারলেস অপারেটর ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে একটি প্রতিষ্ঠানে কিছুদিনের জন্য কাজ করেন। তারপর কাজ ছেড়ে দেন।
ছাত্রজীবনে সরোজ রায় দুরন্ত ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। সেন্টার ফরোয়ার্ডে ভালো খেলতেন। নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন। শরীরচর্চাবিদ হিসাবেও তাঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল। অস্ত্রবিদ্যাতেও ছিলেন দক্ষ, পারদর্শী। শুধু তাই নয়, ছিলেন অসম্ভব সাহসী। অসমসাহসী সরোজ রায় বড়ো বড়ো বিষধর সাপকে অনায়াসে ধরে ফেলতেন। উত্তরজীবনে তাই তাঁকে বিষধর সাপ পুষতে দেখা যায়।
বলিষ্ঠ ও মজবুত শরীর যাতে গড়ে ওঠে তাই সরোজ রায় গড়বেতায় ‘ইয়ং মেন্স অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি ব্যায়ামচর্চা কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। সেখানে গড়বেতার বেশ কিছু যুবক ও ছাত্র নিয়মিত সম্মিলিত হতেন। সেখানে একদিকে ব্যায়ামচর্চা, খেলাধুলা, অস্ত্রশিক্ষা যেমন চলত, তেমনি ব্রিটিশবিরোধী চর্চাও চলত। কিভাবে ইররেজদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করা যায় তার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হত এখান থেকে।
এরপর সরোজ রায় বিপ্লবী যুগান্তর দলের উত্তরবঙ্গ গ্রুপের অবিসংবাদী নেতা যতীন রায় (বগুড়া জেলা)–এর সংস্পর্শে আসেন। ইনি হলেন সেই যতীন রায় যিনি রিক্রুট করেছিলেন শহিদ প্রফুল্ল চাকীকে। যিনি ক্ষুদিরামের সহযোগী হিসাবে কিংসফোর্ডকে হত্যার লক্ষ্যে মজ:ফরপুরে গিয়েছিলেন। সেই যতীন রায় সরোজ রায়কে মেদিনীপুর জেলার সংগঠন গড়ার কাজে দায়িত্ব দিলেন।
ইতিমধ্যে গড়বেতার ব্যায়ামচর্চা কেন্দ্র যে আসলে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলোনের কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছে পুল্লিশের কাছে সে সংবাদ চলে যায়। এই ব্যায়ামচর্চা কেন্দ্রে স্বনামধন্য বিপ্লবী এবং অনুশীলন সমিতির সদস্য বসন্তকুমার সরকার, রামসুন্দর সিংহ প্রমুখদের যাতায়াত ছিল। এই বিপ্লবীরা বেশ কয়েকবার এখানে এসেছিলেন। পুলিশ ওইসময় কয়েকজন যুবকের নামে ‘গড়বেতা ষড়যন্ত্র’ মামলা শুরু করেন। মামলায় স্বাধীনতা সংগ্রামী সুশীল রায়, রামমনোহর সিংহ, অবনীভূষণ চট্টোপাধ্যায়, নলিনীরঞ্জন সিংহ সহ কয়েকজনের ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কলিকাতা হাইকোর্টের আগাম বিচারে সকলেই মুক্তি পেয়ে যান।
কিন্তু সরোজ রায়ের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার অন্য একটি মকর্দমা শুরু করেন। অস্ত্র আইনের ১৯ এফ. বিস্ফোরক আইনের ৪ বি, আক্ট অনুযায়ী সরোজ রায়ের ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ জারি হয়। ১৯৩০-৩১ সালে সরোজ রায়কে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলে স্থানান্তরিত করা হয়।
১৮৩২ সালে সরোজ রায়কে প্রেসিডেন্সি জেল থেকে সরিয়ে আলিপুর সেণ্ট্রাল জেলে নিয়ে আসা হয়। এইসময় বিপ্লবী পবিত্র রায়, সুধী প্রধান, জ্যোতির্ময় সেন, স্বদেশ দাস প্রমুখদের সংস্পর্শে আসেন। আলিপুর জেলে থাকার সময়েই গোপনে চলে আসে সোমনাথ লাহিড়ীর বিখ্যাত বই ‘ রাষ্ট্র ও পরিবর্তন’, লেনিনের ‘স্টেট এণ্ড রেভলিউশনে’র অনুবাদ এবং মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ। সেসব লেখা পড়ে সরোজ রায় হলেন অভিভূত। আর তখন থেকেই নিজেকে একজন আদর্শ কম্যুনিস্ট হিসাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখা শুরু হয়ে গেল তাঁর। আলিপুর সেণ্ট্রাল জেলে সরোজ রায় সহ কয়েকজন বন্দিকে ছাপাখানার কাজকর্মে বিভিন্ন দপ্তরে কাজ দেওয়া হয়। এসময় অনেকের সঙ্গে সরোজ রায়ও কমিউনিজম এবং কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নেন। তখন বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক ছিলেন কমরেড আবদুল হালিম। তাঁর নির্দেশেই সরোজ রায় সহ কয়েকজন আলিপুর সেণ্ট্রাল জেলে কমিউনিস্ট কন্সলিডেশনের মতো একটি গ্রুপ তৈরি করেন। এরপর মার্ক্সবাদ লেনিনবাদের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন সরোজ রায়।
স্বদেশে ফেরার দাবিতে ১৯৩৭ সালে আন্দামান জেলের মধ্যে বন্দিদের শুরু হয় ‘হাঙ্গার স্ট্রাইক’। অনশন ধর্মঘট। ৩৭ দিন ধরে চলতে থকে এই স্ট্রাইক। ঐতিহাসিক এই হাঙ্গার স্ট্রাইক-এর সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে শুধু বাংলা নয় – ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে ছাত্র, যুবক, শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়। জনমানসে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। দিকে দিকে শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। সে ঢেউয়ে কাঁপতে থলে আসমুদ্র হিমাচল। ব্রিটিশ সরকার গুলি, লাঠি দিয়ে এই আন্দোলন থামাতে ব্যর্থ হয়। কমিউনিস্ট পার্টিও বন্দীদের স্বপক্ষে আন্দোলন করেন।
ইংরেজ সরকার বাধ্য হয় বন্দীদের জেল হতে ফিরিয়ে আনতে। সরোজ রায় ১৯৩৮ সালের প্রথম দিকে আন্দামান হতে ফিরে আসেন। ততদিনে তিনি সম্পূর্ণভাবে কমিউনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে পড়েছেন।
এ প্রসঙ্গে যে তিনজনের কথা উল্লেখ না করলে সরোজ রায় সম্পর্কে কিছু বলা ও লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে তাঁরা হলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী দেবেশ দাশ, ভূপাল পাণ্ডা এবং মোহিনী মণ্ডল। ভূপাল পাণ্ডা ছিলেন আন্দামান সেলুলার জেলের কমিউনিস্ট কন্সলিডেশনের সভ্য। মোহিনী মণ্ডল ছিলেন বক্সা ক্যাম্পের কমিউনিস্ট কন্সলিডেশনের সভ্য এবং দেবেন দাশ ছিলেন বিভিন্ন জেলে থাকা কমিউনিস্ট কন্সলিডেশনের সদস্য।
দেবেন দাশ, সরোজ রায়, ভূপাল পাণ্ডা এবং মোহিনী মণ্ডল এই চারজন বিপ্লবী ১৯৩৮ সালের ১ মে খড়্গপুরের গিরি ময়দানে লালঝাণ্ডা তোলেন। ইংরেজদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সর্বপ্রথম মেদিনীপুর জেলায় শুরু করেন কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের কাজ। কয়েকমাসের মধ্যে বেশ কিছু সদস্য সংগহ করে ফেলেন। ১৯৩৮ সালের ২৫ অক্টোবর মেদিনীপুয়ে জেলাতে কমিউনিস্ট পার্টির তদানীন্তন প্রাদেশিক কমিটির নির্দেশে খড়্গপুর শহরে দেবেন দাশ, সরোজ রায়, ভূপাল পাণ্ডা এবং মোহিনী মণ্ডলকে নিয়ে অনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিস্ট পার্টির “জেলা সাংগাঠনিক” (District Organising Committee) গঠিত হয়। সম্পাদক নির্বাচিত হন সরোজ রায়। এই চারজন পার্টি সভ্যপদের নম্বর ছিল-দেবেন দাশ-১০১, সরোজ রায়-১০২, ভূপাল পাণ্ডা-১০৩, এবং মোহিনী মণ্ডল-১০৪।
চন্দ্রকোণার বিশিষ্ট সাহিত্যিক, বাগ্মী, স্বাধীনতা সংগ্রামী-সত্য ঘোষাল কমিউনিষ্ট নেতা দেবেন দাশকে বলেছিলেন ‘রাজনীতির রনাঙ্গনে সূতপুত্র’। তিনি ছিলেন মানবপ্রেমিক চিরসংগ্রামী সর্বস্বত্যাগী। ১৯০৭ সালের ৭ জানুয়ারি অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার ঐতিহাসিক মদনমোহন চক গ্রাম সন্নিকট খড়্গপুর লোকাল থানার পাঁচপাড়া গ্রামে দেশবরেণ্য নেতা দেবেন দাশের জন্ম। পিতা-উদ্ধবচন্দ্র দাশ, মাতা বিন্দুবালা দাশ। আমৃত্যু নিজেকে মানব সেবায়, সমাজ সেবায় ব্রতী রেখেছিলেন।
দেবেন দাশের মতো মোহিনীমোহন মণ্ডলও ছিলেন একজন বড়ো মাপের স্বাধীনতা যোদ্ধা এবং আদর্শ কমিউনিষ্ট। দাসপুরের ব্রাহ্মণবসান গ্রামে ১৯০৫(মতান্তরে ১৯০৯) সালে তাঁর জন্ম হয়। বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন। তারপর ধীরে ধীরে কমিউনিষ্ট আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়েন। সেইসঙ্গে মেদিনীপুর জেলাতে কমিউনিষ্ট পার্টি সংগঠন গড়ে তোলার কাজে অগ্রণী ভূমিকা নেন। ১৯৩৩-৩৭ খ্রিস্টাব্দ এইসময়ে মোহিনী মণ্ডলকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়। ১৯৪২ সালে ৪ ফ্রেব্রুয়ারী ভয়ঙ্কর টাইফয়েড আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পুলিশের ভয়ে তাঁর মৃতদেহ সত্কাার করা পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। রাতের অন্ধকারে কংসাবতীর পাড়ে সানকীদের বাড়ির পার্শ্ববর্তী বাঁশবনে বালি খনন করে তাঁকে গোপনে সমাহিত করা হয়।
দেবেন দাশ, মোহিনী মণ্ডল, সরোজ রায় এবং ভূপাল পাণ্ডা এই চারজন বিপ্লবী যে কতখানি একাত্ম ছিলেন তা সত্য ঘোষালের একটি লেখায় টের পাই। সত্য ঘোষাল লিখেছিলেন-
“চলে গেলেন। যেতে পারছিলেন না। বোধহয় ১০২ নম্বরের জন্য। ১০২ নম্বর কার্ডধারী সরোজ রায় তখনও আসেন নি। এসেছিলেন কয়েকদিন আগেই ১০৩ নম্বর কার্ডধারী ভূপাল পান্ডা। ১০৪ নম্বর মোহিনীমণ্ডল বক্সা ক্যাম্পের কমিউনিষ্ট কন্সলিডশনের সভ্য তো চলে গেছেন বহুপূর্বেই ১৯৪২-এর ফেব্রুয়ারি দাসপুর থানার চেঁচুয়া গ্রামে টাইফয়েড। তাই বোধহয় শেষের ক’টা দিন যাই যাই করেও যেতে পারছিলেন না ১০২ নম্বরের জন্য। শুয়ে শুয়ে নীরব অবহেলায় সহ্য করেছিলেন অক্সিজেন আর স্যালাইনের অহেতুক যন্ত্রণা। সরোজ রায় এসেছিলেন সকালের দিকে। রাত্রে চলে গেলেন দেবেন দাশ”।
১৯৪৩ সালে মেদিনীপুর জেলা কমিউনিষ্ট পার্টির সম্মেলন শুরু হয় ধরণী গোস্বামীর উপস্থিতিতে। সরোজ রায় পুনরায় সম্পাদক নির্বাচিত হন।
এরপর থেকে সরোজ রায় নিজেকে পুরোপুরি দেশের কাজে, মানুষের কল্যাণে সঁপে দেন। ১৯৩৯ সাল হতে মেদিনীপুর জেলায় দুর্বার কৃষক আন্দোলন শুরু করেন। সাঁজা প্রথার বিরুদ্ধে এবং তমলুক মহকুমায় শুরু হয় তীব্র ভাগ ধানের আন্দোলন (মালিকের ৯ ভাগ চাষির ৭ ভাগ ছিল) আন্দোলন ব্যাপক ও সংগ্রামী রূপ নেয়। তখন বাধ্য হয়ে জেলাশাসক শ্রী বি. আর. সেন মীমাংসার জন্য মহিষাদলে একটি বৈঠক ডাকেন। সরোজ রায়ের উপস্থিতিতে মিমাংসা হয়। আধাআধি ভাগ সাব্যস্ত হয়। বাজে আবহাওয়ার আদায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই সময় কৃষিঘাতক আইন সম্পর্কে ঋণ সলিসি বোর্ডকে কার্যকরী করার জন্য জেলা ব্যাপী ব্যাপক প্রচার আন্দোলন চালানো হয়। সারা মেদিনীপুর জেলায় কৃষক আন্দোলনের মাধ্যমে, কমিউনিস্ট পার্টিকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
সরোজ রায় কৃষক আন্দোলন, কমিউনিষ্ট পার্টির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন যেমন করতেন তেমনি খড়গপুর শহরে রেলকর্মীদের নিয়ে গড়ে তোলেন শক্তিশালী রেলশ্রমিক ইউনিয়ন। রেলশ্রমিকদেরও দায়িত্ব দিলেন।
১৯৪৬ সালের নির্বাচনে রেলকেন্দ্র থেকে কমরেড জ্যোতি বসু কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রখ্যাত পন্ডিত হুমায়ুন কবীরকে পরাস্ত করে জয়যুক্ত হয়েছিলেন। রেল শ্রমিকদের ব্যাপক ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে সরোজ রায়, দেবেন দাশ এবং অশ্বিনী রায় – এর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। রেলকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এই অশ্বিনী রায়ের চাকরি চলে যায়।
১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে তত্কা্লীন কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি ঘোষণা করে। কমিউনিস্ট পার্টিরও সামন্ততন্ত্র ও জোতদারী প্রথার বিরুদ্ধে সারা দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন শুরু করে। অন্ধ্রের তেলেঙ্গানায় নিজামদের বিরুদ্ধে, ত্রিবাঙ্কুর কোচিনে মহারাজার বিরুদ্ধে, উত্তরপ্রদেশে আজমগড়ে এই আন্দোলন যেমন তীব্র আকার ধারণ করে, কয়েক হাজার কমিউনিস্ট প্রাণ দেয়, অনেকে জেলে যায়; তেমনি পশ্চিমবঙ্গে মথুরাপুর, কাকদ্বীপ, মেদিনীপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন তীব্র হয়। সরোজ রায় আত্মগোপন অবস্থায় কেশপুর, গড়বেতা, বাঁকুড়া জেলার জয়পুর, বিষ্ণুপুর থানায় ১৯৪৯ সালে এই আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনে বহু যুবক ও মহিলার প্রাণ যায়। যাকে বলা হয় রক্তাক্ত কৃষক আন্দোলন।
১৯৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচলে সরোজ রায় গড়বেতা কেন্দ্র থেকে বিধানসভায় নির্বাচিত হন। ৫ বার গড়বেতা হতে বিধানসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিধানসভায় তাঁর ভাষণ ছিল আটন্ত উঁচু ধরনের, সুবক্তা ছিলেন তিনি। সেজন্য কংগ্রেসী সদস্যরাও, এমক কী মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান রায় পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য মন দিয়ে শুনতেন। ডা. রায় সরোজ রায়কে অত্যন্ত স্নেহ করতেন।
১৯৫৫ সালে গোয়া মুক্তি আন্দোলনে সরোজ রায় পশ্চিমবঙ্গসহ তিনটি প্রদেশের আন্দোলনকারী দলের নেতৃত্ব দেন। কমিউনিস্ট পার্টি সরোজ রায়কে নেতা নির্বাচিত করেছিলেন। গোয়া হতে গড়বেতায় ফিরে এলে গড়বেতায় তাঁকে বিপুলভাবে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ওই সময় বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী রামসুন্দর সিংহ সরোজ রায়ের বাড়িতে গিয়ে অভিনন্দন জানিয়ে আসেন। প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী বসন্ত কুমার সরকার চিঠি দিয়ে অভিনন্দন জানান।
১৯৫৯ সালে খাদ্য আন্দোলনের প্রস্তুতিতে এবং কেরলের প্রথম কমিউনিস্ট সরকারকে উচ্ছেদ করার কংগ্রেস দলের চক্রান্তের প্রতিবাদে সরোজ রায় মেদিনীপুর ও বাঁকুড়া জেলার বহু জায়গায় জনসভা করে শক্তিশালী জনমত গড়ে তোলেন।
১৯৪৬ সালে দেশব্যাপী যে জাতিদাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হয়েছিল তার উত্তাপ গড়বেতা, কেশপুর এবং মেদিনীপুর শহরেও পড়েছিল। গড়বেতায় যাতে উত্তেজনা ছড়াতে না পারে তরজন্য সরোজ রায় নির্ভীক চিত্তে গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষকে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামী বসন্ত সরকার, গোবিন্দ কুমার সিংহ, রামসুন্দর সিংহ প্রমুখদের ভূমিকাও ছিল অতুলনীয়।
১৯৫৮-৬২ সালে গড়বেতায় খাদ্য ও কাজের তীব্র সমস্যা দেখা দেয়। ঐ সময় সরোজ রায় বিধানসভায় সে পরিস্থিতির খবর দৃঢ়তার সঙ্গে যেমন তুলে ধরেন তেমনি গড়বেতার জোরদার আন্দোলনও শুরু করেন এর সমাধানে। ডা: রায়ের সরকার বাধ্য হয় গড়বেতার জন্য ব্যাপক রিলিফের টাকা মজুর করতে। গ্রামাঞ্চলের মাটির রাস্তাগুলি ঐ সময়েই তৈরি হয়েছিল।
১৯৭০ সালের বেআইনি জমি উদ্ধারের কাজে জেলার বিশেষ করে গড়বেতা, শালবনী থানার ব্যাপক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সরোজ রায়। ১৯৭২-৭৬ মধ্যে তিনি স্কুলবোর্ডের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য থাকাকালীন গড়বেতা, চন্দ্রকোণারোড, শালবনী প্রভৃতি এলাকায় তীব্র পানীয় জলের সংকট ছিল। সেই সমস্যার কথা তিনি বিধানসভায় তুলে ধরেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার টাকা মঞ্জুর করেন।
ক্ষেতমজুর আন্দোলনে সরোজ রায় ছিলেন অবিসংবাদী নেতা। ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি ছিলেন তিনি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের অধিকার ও মর্যাদার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের প্রতি ছিল অবিচল বিশ্বাস। মার্কসীয় দর্শনে ছিল সুগভীর আস্থা। কমিউনিস্ট স্বধর্ম থেকে মুহূর্তের জন্যও ভ্রষ্ট হননি তিনি। তিনি ছিলেন সর্বহারার বন্ধু, বিপ্লবী যোদ্ধা। অকৃতদার এই মানুষটি প্রকৃত অর্থেই ছিলেন জননেতা। ভারত মায়ের শৃঙ্খলমোচনে একদিন তিনি আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই তিনি পরবর্তীকালে গরিব মেহনতি জনগণের সেবায় নিজেকে উত্সদর্গ করেছিলেন। মাটির টান, দেশের মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ তাঁকে সত্যিকারেরই এক উচ্চাসনে বসিয়েছিল। সেইজন্যই তো গড়বেতার আপামর জনসাধারন এমনকি বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতৃত্বও সরোজ রায়কে অন্তর থেকে ভালবাসতেন, শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতেন। তিনি ছিলেন দুরন্ত কিন্তু অতি নম্র-ভদ্র-বিনয়ী। সূর্যের মত উজ্জ্বল কর্মময়-বর্ণময় জীবন ছিল সরোজ রায়ের। একাধারে ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী-দেশপ্রেমিক, অন্যদিকে, অন্যদিকে বিরাট মাপের জননেতা। ১৯৯৪ সালের ৫ মে মধ্যাহ্নে তাঁর জীবনদীপ নিভে গেল। চলে গেলেন অবিভক্ত বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির ১০২ নম্বর কার্ডধারী সদস্য সরোজ রায়।
গড়বেতার মানুষ সরোজ রায়কে ভুলে যাননি। মনে রেখেছেন। মনে রেখেছেন বলেই তো গড়বেতা ব্লকের অনতিদূরে স্থাপিত হয়েছে বহু আকাঙ্ক্ষিত তাঁর একটি আবক্ষ মূর্তি। ২০০৫ সালের ১ লা অক্টোবর সরোজ রায়ের এই আবক্ষমূর্তির আবরণ উন্মোচন করেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মাননীয় মন্ত্রী নন্দগোপাল ভট্টাচার্য। উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত অধ্যাপক দীপক সরকার।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ছিল তিনটি ধারা। একটি ধারা হল গান্ধীজির অহিংস আন্দোলন। দেশের ব্যাপক অংশের মানুষ এতে যোগদান করেছিলেন। আর একটি ধারা হল মুক্তিকামী দামাল ছেলেদের সহিংস আন্দোলন। এঁরা ‘জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য’ করে ফাঁসির মঞ্চে গেয়েছিলেন জীবনের জয়গান। ব্রিটিশ রাজশক্তির অত্যাচারী আমলাদের হত্যা করা, তাদের সন্ত্রস্ত রাখা এঁদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। ব্রিটিশ প্রভুদের চোখে এঁদের পরিচয় ছিল সন্ত্রাসবাদী হিসাবে। এঁরা মানুষের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস করেননি। সন্ত্রস্ত করেছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে। তৃতীয় ধারাটি ছিল শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি জনগণের মধ্যে বৈপ্লবিক গণসংগ্রাম সৃষ্টি করা। এঁরা মানবমুক্তির শ্রেষ্ঠ মতবাদ মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামী সরোজ রায় এই তৃতীয় পথটিকেই বেছে নিয়েছিলেন এবং সমগ্র জীবনকে সেই আদর্শেই নিয়োজিত রেখেছিলেন। আমরা তাঁকে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে সেলাম জানাই।
midnapore.in