বাঙলার

বাঙলার "চড়ক গাজন" আসলে শিবের বিয়ের উৎসব

Bengal's "Charak Gajan" is actually Lord Shiva's wedding festival

ভাস্করব্রত পতি।


"হাসি কহে মহাদেবে দেবী হৈমবতী / ওহে কান্ত কর শান্ত করি হে মিনতী / লালায়িত আমি বর্ষফলের কারণ / বর্ষাধিপ চন্দ্রগ্রাস কহ বিবরণ / মন্ত্রী নাগেন্দ্র শস্যাধিপ আদি করি / নিব্বিঘ্নেতে আশুতোষ বলহ বিচারি / বাক্য শুনি শিব জ্ঞানী শঙ্কর কহিল / শঙ্করী শুনিয়া মহা হরষিতা হৈল" ।

বাঙলার
মেদিনীপুরে "চড়ক গাজন" উৎসব। ছবিঃ অরিন্দম ভৌমিক।

এখন চৈত্র মাস । তীব্রতর দাবদাহ শুরু । আর এসময়ই হিন্দুদের দেবতা মহাদেবের বহুল জনপ্রিয় চড়ক গাজন উৎসব । গাঁয়ের জনগনের একান্ত আপনার উৎসব এই 'গাজন' । এই চৈত্র - বৈশাখেই শোনা যায় গাজনের ঢাক । গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উঠে আসা একান্ত নিজস্ব শ্রদ্ধা , ভক্তি আর ভালোবাসার মিশেলে জন্ম নেওয়া এই লোক উৎসবটি এখনও কোরোনা ভাইরাসের করাল গ্রাসে আচ্ছন্ন। গত বছরের তুলনায় এবছর কোরোনার প্রভাব বাড়লেও এবার কিন্তু চড়ক গাজন উৎসব পালনে খামতি নেই।

গাজন আসলে কি? এই "গাজন" শব্দে রয়েছে 'গাঁ' বা গ্রাম ' এবং ' জন ' বা জনসাধারণ । মোটকথা গাঁয়ের জনসাধারণের উৎসব । তারাপদ সাঁতরা 'বাংলার প্রকৃত গণ উৎসব' বলে উল্লেখ করেছেন 'গাজন'কে । হরিদাস পালিত " বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ " পত্রিকায় (১৩১৮) লিখেছেন -- " জনগনের চিৎকার, বিপুল বাদ্যোদমে গর্জন , তাই বোধ হয় উৎসব কালক্রমে গাজন নামে অভিহিত হইয়া থাকিবে "।

বাঙলার
মেদিনীপুরে "চড়ক গাজন" উৎসব। ছবিঃ অরিন্দম ভৌমিক।

জনপ্রিয় 'হুতোম প্যাঁচার নক্সা' তে এই চড়কের বর্ণনা পাই । ফ্যানি পার্কস , এলিজা ফে রা বহুদিন আগে লিখেছেন সেকালের চড়ক । অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ লিখেছেন চড়কের মাহাত্ম্য । স্মিথ লিখিত উইলিয়াম কেরির জীবনীতেও ( পৃষ্ঠা ২৫৫-২৫৬ ) চড়কের ভয়াবহ দৃশ্যের চিত্র আছে । দক্ষিণ ভারতেও চড়কপূজার রীতি আছে । সেখানে চড়কের নাম 'চুড্ডেল' !

হিন্দুদের বিশ্বাস, শিবের জন্ম হয়েছে শ্রাবণ মাসে । আর বিবাহ হয়েছে এই চৈত্র মাসের শেষে । তাই চৈত্র মাস হল 'মধুমাস' । চৈত্র শেষের এই উৎসব আসলে শিবের বিবাহোৎসব । নীলকন্ঠ শিবের সাথে নীল পরমেশ্বরী বা চণ্ডিকার বিবাহে শিবের অনুগামীদের মধ্যে পাওয়া যায় ভূত , প্রেত , দত্যি , দানবদের । পৌরাণিক কাহিনী সে কথাই বলে । তাই এই মধুমাসে শিবের বিবাহকে স্মরণ করেই এ সময় প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় গাজন উৎসব ।

বাঙলার
মেদিনীপুরে "চড়ক গাজন" উৎসব। ছবিঃ অরিন্দম ভৌমিক।

গাজনের মূল উপাসক যাঁরা , তাঁদের বলে 'ভক্তা' । তাঁরা যেন শিবের অনুচর । যাঁরা কিনা অনার্য ভারতীয় । অর্থাৎ শিবের গাজন হোলো অনার্যদের একটি উৎসব । বিবাহের বরযাত্রী হয়ে তাঁদের পালন করতে হয় নানা উপাচার ও লোকাচার । ঢাকের বাদ্যি , শিঙার শব্দ সহ জনকল্লোলের যে 'গর্জন' উৎপত্তি হয় এই উৎসবে , তাই-ই কালে এবং কালোত্তরে পরিবর্তিত হয়ে নামকরণ হয়েছে " গাজন " ! সংস্কৃত শব্দ 'গর্জন' থেকে প্রাকৃত শব্দ 'গজ্জন' হয়ে বাংলায় 'গাজন' এসেছে । যে চড়ক গাছে পিঠফোঁড়েরা ঘোরে তাকে বলে 'গজারি' । যা কিনা শিবের অন্য নাম । আর 'চক্র' শব্দ থেকে এসেছে 'চড়ক' কথাটি । গজারির মাথায় চক্রাকারে ঘোরাই হোলো 'চড়ক' ।

শিব 'নীলকন্ঠ' নামে পরিচিত । তাছাড়া শিবের আরেক নাম 'নীলার্ক' । তাই বাংলার এই গাজনকে বলে 'নীলপূজো' ! আর মহিলারা করেন 'নীলের ব্রত' । দক্ষিনবঙ্গে যা নীলপূজা , তাই-ই উত্তরবঙ্গে তথা মালদহে 'গম্ভীরা' । একে সংস্কৃতে বলে 'কালার্করুদ্রপূজা' । অর্থাৎ কাল সদৃশ ভীষণ অর্ক বা সূর্যের পূজা । গবেষক চিন্তামনি চট্টোপাধ্যায়ের মতে -- " কতদিন হতে চড়ক পূজা আমাদের দেশে প্রবর্তিত তাহা নির্নয় করা কঠিন । তবে এ দেশে যে পূজাপদ্ধতি বিরাজমান , বিশ্লেষন করিয়া দেখিলে তাহার অন্তরালে বৌদ্ধ প্রভাব যে সমধিক পরিমানে বিদ্যমান , তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই " ।

বাঙলার
মেদিনীপুরে "চড়ক গাজন" উৎসব। ছবিঃ অরিন্দম ভৌমিক।

সেই গাজন উৎসব এখন করোনার ভয়ে ভীত । ম্রিয়মান হয়ে যাচ্ছে চড়ুকে ঢাকের আওয়াজ । পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তীর্ন এলাকায় পালিত হয় চড়ক গাজন । পিঠফোঁড় , বাণফোঁড় , চাটুফোঁড় , রজনীফোঁড় , বঁটিঝাঁপ , হিন্দোলা , কাঁটাঝাঁপ , ভুঁইশাপটা , মানিকচুরি , বেতচালা , মাড়োঘাঁটা , মাগন করা , রজ্জুফোঁড় , নীলের ব্রত , বেতচালা , মাথা চালা , আগুনে হাঁটা , হাকুন্দ পড়া , সঙ নাচ , কালী নাচ সহ আরও নানা উপাচারের দেখা মেলে এই গাজন উৎসবে । ষোড়শ ভক্তার সাতদিন ধরে নিরামিষ খেয়ে শিবমন্দিরে থেকে কৃচ্ছ্বসাধন করাই অন্যতম বিষয় । সংক্রমনের ভয়ে মন্দিরগুলো বন্ধ ছিল গতবার । এবারেও জনসমাগমের ক্ষেত্রে প্রবল বাধানিষেধ জারি হয়েছে । মানুষ কিন্তু হাসিমুখে মেনে নেয়নি এবার । খুল্লমখুল্লা ভাবেই মাতোয়ারা সবাই ।

তাইতো এবছর ফের আগের মতো শুরু হয়েছে বনমালী কালুয়ার রুদ্রেশ্বর , কুমরপুরের হটেশ্বর , পাঁচরোলের মুক্তেশ্বর , মাড়তলার সত্যেশ্বর , কেশপুরের ঝাড়েশ্বর , কিশোরচকের আনন্দেশ্বর , পিংবনীর জলেশ্বর , জলচকের তিলেশ্বর , মাসুড়িয়ার স্বপ্নেশ্বর মহারুদ্র , মোঘলমারির চন্দনেশ্বর , পাঁচপুকুরিয়ার রামেশ্বর , তমলুকের চক্রেশ্বর শিবমন্দিরের মতো শতাধিক মন্দিরের চড়ক গাজন । কোথাও কোথাও পিঠফোঁড় গাজন ছিল মুখ্য আকর্ষণ । গতবার পিঠফোঁড় করে উপার্জন করা যে মানুষগুলো কাজ হারিয়ে চুপচাপ ছিল, এবার তাঁরা যেন একটু আলোর দিশা দেখতে পেয়েছে । বছরের এই সময়টা ভালো অঙ্কের উপার্জন হোতো দুলাল সাঁতরা , বেনু দাস , বিজয় দাস , তপন দাস , নকুল দাস প্রমুখ এক শ্রেনীর গরিব মানুষের । গতবছর হয়নি বললেই চলে ।

বাঙলার
মেদিনীপুরে "চড়ক গাজন" উৎসব। ছবিঃ অরিন্দম ভৌমিক।

দুই মেদিনীপুর ছাড়াও এই চড়ক গাজন বেশ জনপ্রিয় উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বানচাবড়া , পাথরপ্রতিমা , চিত্রশালী , দক্ষিণ বারাসত , বেলপুকুর , শিবকালীনগর , জয়রামপুর , বাঁকুড়ার মটুকবনি , ডিহিপাড়া , কাকরবেড়ে , নদীয়ার চাকদহ , তাঁতিপাড়া , শান্তিপুর , ঘুর্নি , দোগাছিয়া , বর্ধমানের সোনপলাশি , কুড়মুন , হুগলীর তারকেশ্বর , নরসিংবাটি , খানাকুল , কোচবিহারের সাগরদিঘী , তুফানগঞ্জ , মালদহের আইহো তে ।

এই সময় মুর্শিদাবাদের জলঙ্গী , সাগর দিঘী , বেলডাঙা , নওদা , ডোমকল , নবগ্রাম ভরতপুর , বর্ধমানের যজ্ঞেশ্বরডিহি , কাটোয়া , অগ্রদ্বীপ , উদ্ধারণপুর , চাবুকপুর , সাহাপুর , নদীয়ার কৃষ্ণগঞ্জ , দেবগ্রাম , পালাচণ্ডীতে 'বোলান' গান হয়ে ওঠে লোকায়ত জনজীবনের স্বজলধারা । রঙপাঁচালী বোলান , পালাবন্দী , সাঁওতেলে , রণপা বোলান , পোড়ো বোলান এবং ডাক বোলান -- এই সব বোলানে মাতোয়ারা হয়ে বাংলার মানুষ । তেমনি উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত 'গম্ভীরা' গান এসময়ই হয়ে থাকে । শিবের আরেক নাম 'গম্ভীর' । মন্দিরের মধ্যে যে চৌবাচ্চার মতো কূপ থাকে তাই-ই 'গম্ভীর' । ওড়িয়া ভাষায় 'গম্ভীরা' কথার অর্থ হল 'ক্ষুদ্র নির্জন কক্ষ' । তাই শিবমন্দির হল 'গম্ভীরা' । মালদহের মেস্তরপাড়া , হাবিবপুর , ধ্যামধ্যামা , মাতৈল , শালতোলা , গৌরচন্দনবাটি , সিমলা , বাসরাতে গম্ভীরার প্রভাব সর্বাধিক । তা এই কোরোনার দাপটে কিছুটা হলেও নিষ্প্রভ ।

বাঙলার
শিব ঠাকুরের বিয়ে। Photo Courtesy: Ashley Van Haeften

মেদিনীপুরের চড়ক গাজন উৎসবে গাজনের গানেও (মাঙন বা মাগন গান) গাওয়া হয় বাঘের কথা । ড. সুব্রত মুখোপাধ্যায় সেরকমই একটি মাগনের গান ( সূবর্ণরৈখিক ভাষাতে) উল্লেখ করেছেন 'পাটভক্তা কহুছি কথা / কাঁহিক যিব তুই ? / বাটরে গুটায় কেন্দুয়া বাঘ / দেখি আইনু মুই / উটে তার হাঁড়িয়া তুঁঢ় নম নেজুড় / চালতাপারা চোখ / খাইব সবজনকু গিলিব সবজনকু' । কি বলতে চাইছে তা সহজেই অনুমেয় । গোপীবল্লভপুর ২ নং ব্লকে রয়েছে ব্যাঘ্রেশ্বর মন্দির । এখানকার শিবের নাম । কথিত আছে যে, এই শিবকে পাহারা দিতো বাঘ । এছাড়া এখানে বাঘের নামে গ্রামনাম রয়েছে 'বাঘঘোরা' এবং 'বাঘডুবি' । আর খোদ জঙ্গলমহলের বুকে বাঘের উপদ্রব থেকে রক্ষার জন্য মানুষ পূজা করেন 'বাঘুৎ' দেবতা । অথচ জঙ্গলমহলে হঠাৎ দেখতে পাওয়া রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে নিধন করে দেয় এক শ্রেনীর অবিবেচক মানুষ । ২০১৮ এর ১৩ ই এপ্রিল 'বাঘঘোরা' গ্রামে ঘটে গিয়েছিল সেই ভয়ানক বাঘ হত্যাকাণ্ড ।

গতবছর থেকে সবকিছুই পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে মরণমুখী কালাত্মক কোরোনা ভাইরাসের দাপটে । শিবের ভয়ঙ্কর অনুচর ভূত , প্রেত , দত্যি, দানবদেরও সাধ্য নাই এই কোরোনার সাথে লড়াই করার । বিশ্ব চরাচরের রক্ষাকর্তাও আজ অবদমিত কোরোনা আতঙ্কে । তবুও মন শুনতে চায় হুহুঙ্কার তোলা আর শিবমন্দিরে পাকদণ্ডী খাওয়া " ভোলেবাবা পার করেগা , গাঁজায় মেরে টান / রোগ- শোক - ক্ষোভ - দুঃখ ভুলে , গাজন মেলায় যান " ।


midnapore.in

(Published on 14.04.2021)