নববর্ষের লোকাচারে সংস্কৃতিবান বাঙালি | Cultured Bengalis in New Year's folklore

নববর্ষের লোকাচারে সংস্কৃতিবান বাঙালি

Cultured Bengalis in New Year's folklore

ভাস্করব্রত পতি।


"বাংলা নববর্ষের প্রতি বাঙালির আলাদা টান। আলাদা আবেগ। আলাদা ভালোবাসা। বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই সংস্কৃতিবান বাঙালি মেতে ওঠে নানা ধরনের লোকাচারে। চলতি বছরেও মারণ কোরোনা ভাইরাসের তাণ্ডবে কিছুটা হলেও ম্রিয়মান বাঙালির মনন এবং চিন্তন। কিন্তু হুজুগে বাঙালি অবশ্য ভাইরাস মানেনা। নিজস্ব অনুভূতিগুলো বিসর্জন দিতেও চায়না।

বাঙলার
তুলসীতলায় হয় 'বসনঝারা'। ছবিঃ অরিন্দম ভৌমিক।

বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই বাড়ির তুলসীতলায় দেওয়া হয় 'বসনঝারা'। নতুন কেনা মাটির ভাঁড়ে ফুটো করে সেটা ঝোলানো থাকে বেল, অশ্বত্থ, মনসা, বট, তুলসী গাছের ওপরে। এই ভাঁড়ের ফুটোতে দূর্বাঘাস গোঁজা থাকে। ভাঁড়ে জল ঢাললে সারাদিন ফোঁটা ফোঁটা করে জল পড়ে গাছে। আসলে গ্রীষ্মের খরতাপে গাছ বাঁচানোর অভূতপূর্ব কৌশল বাঙালির এই 'বসনঝারা' বা 'বসুন্ধরা' দেওয়ার লুপ্তপ্রায় লোকাচারের মাধ্যমে। সারা মাস জুড়ে চলে তা। লোকসংস্কৃতি গবেষক ড. সুস্নাত জানার কথায়, প্রতিটি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটা বিজ্ঞানমনস্কতা কাজ করে। আমরা জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে সংস্কৃতিগুলো পালন করে আসলে বিজ্ঞানকেই প্রাধান্য দিচ্ছি।

এছাড়া নববর্ষের দিনের সকালে শুকনো পাতা কুড়িয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে আঁশ বঁটি গরম করে বাড়ির লোকজন এবং গবাদিপশুর পায়ে ছ্যাঁকা লাগানোর নিয়ম আছে। লোকগবেষক তথা বিশিষ্ট সমাজসেবী ঝর্ণা আচার্য বলেন, আসলে এসময় শুকনো পাতা জমা হয় বাড়ির আশপাশে। সেগুলো জড়ো করে পুড়িয়ে ফেলার কাজও হোলো। এলাকার পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকলো। তাছাড়া গরম ছ্যাঁকা লাগানোর মাধ্যমে বিভিন্ন জীবানু নাশ হয়। এছাড়া বাঁশের ঝাড়ে মাটি দেওয়া, গরুকে স্নান করিয়ে শিংয়ে তেল মাখানো, ধান ক্ষেতে গোবর সার দিয়ে হাল করা ইত্যাদি করা হয় এদিনই। এমনকি মুড়ির ছাতু খাওয়ার রেওয়াজও আছে । সেইসাথে নাপিতের দেওয়া কাঁসার চকচকে আয়নায় বাড়ির লোকজন মুখ দেখেন সবাই। লোকসংস্কৃতির লেখক তথা শিক্ষক ড. শ্যামল বেরা জানান, সংস্কৃতিপ্রিয় বাঙালি কোনভাবেই তাঁর সংস্কৃতিকে ভুলতে চায়না। আজকের কঠিন পরিস্থিতিতেও বাঙালি জাতি তাঁর চিরন্তন ধারাকে যথাসম্ভব এগিয়ে নিয়ে চলবে আপন গতিতেই।

বাঙলার
বৈশাখের প্রথম দিন রসগোল্লা।

বিশ্বের প্রথম মহাকাব্য "গিলগামোস" অনুসারে খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০০ তে আসিরীয় সাম্রাজ্যের নিনেভা নগরীর টাইগ্রিস নদীর ধারে পালিত হয়েছিল বিশ্বের প্রথম নববর্ষ উৎসব! ভারতে খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে বৈদিক কাব্যানুসারে ( তৈত্তিরীয় , পঞ্চবিংশ ও কৌষিতকী ) পালিত হয়েছিল নববর্ষ তথা "মহাব্রত" !

মিশরে ফারাওদের সময়ে খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে শুরু হয়েছিল নববর্ষ উদযাপন! এথেন্সে খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে শুরু হয়েছিল নববর্ষ পালন। হোমারের লেখাতেও তা মেলে!

প্রতি বছর পয়লা জানুয়ারি পালন করা হয় ইংরেজি নববর্ষ হিসেবে। ত্রয়োদশ পোপ গ্রেগরি তৈরি করেন "গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার"। সেখানে এই তারিখেই বছরের প্রথম দিন বলা হয়েছে! রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার ৪৬ খ্রীষ্টপূর্বতে এই তারিখেই নববর্ষ পালন করেছিলেন! কিন্তু প্রাচীন গ্রিসে ২১ শে জুন ছিলো নববর্ষ! রাশিয়াতে ১৪ ই জানুয়ারি, চিনে ২১-২৯ জানুয়ারি, তাইওয়ান, কোরিয়া, হংকং, তাইল্যাণ্ড, মালয়েশিয়াতে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নববর্ষ পালিত হয়! পারস্যে ২১ মার্চ পালিত হয় নববর্ষ - 'নওরোজ'! এছাড়া পাকিস্তান ও মালদ্বীপে ১৭ ই এপ্রিল, ইয়েমেনে ৬ ই এপ্রিল, নেপালে ১৪ ই এপ্রিল নববর্ষ পালিত হয়। ইন্দোনেশিয়ায় আবার দুটি নববর্ষ হয়!

বাঙলার
তুলসীতলায় হয় 'বসনঝারা'। ছবিঃ অরিন্দম ভৌমিক।

জাপানে নববর্ষের দিন নতুন জামা পরে লোকজন। পার্সিরা ডিম উপহার দিতো! কেন্টিকরা দিতো নানা অলঙ্কার! নববর্ষের দিন আজটেক ও মায়া সভ্যতায় যাগযজ্ঞ হতো নরবলির মাধ্যমে! পেরুতে এদিন টিটিকাকার কালো জল লাল হয়ে উঠতো রক্তের হোলিতে!

ঋতুবৈচিত্র্যে বৈশাখ মাসটি অন্নদাতার সূচনা মাস। চাসবাস ও শষ্য রোপন করাই যাঁদের জীবিকা তাঁদের কাছে নববর্ষটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পৌষমাস যেমন ফসল শেষ করে গোলায় ভরার মাস, তেমনি বৈশাখ হোলো শুরুর মাস। গনেশ পূজার প্রচলন সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই। আস্তে আস্তে অবাঙালি এই সংস্কৃতিকে বাঙালিরা আত্মীকরণ করে নিয়েছে হালখাতার সাথে সাথেই। আমরা বাঙ্গালিরা নববর্ষ পালন করি পয়লা বৈশাখের দিন! যদিও একসময় তা পালিত হতো অগ্রহায়ণ মাসে। 'অগ্র' অর্থাৎ প্রথম এবং 'হায়ণ' হলো বছর!

বাঙলার
তুলসীতলায় হয় 'বসনঝারা'। ছবিঃ ভাস্করব্রত পতি।

তবে সবাই বছরের প্রথম দিন হিসেবে বৈশাখকে ধরেনা। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষজনের কাছে পয়লা মাঘ হোলো 'মাগসিম' উৎসব বা নববর্ষ। বিদেশিদের মতো পয়লা জানুয়ারি নববর্ষ উদযাপন করে মিজোরাম, নাগাল্যান্ড সহ ত্রিপুরার লুসি ও টুকাই উপজাতীয় লোকজন। তামিলদের 'পুটুবর্ষ পিরাপ্পু' পালিত হয় 'চিহিরাই' মাস এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে। তেমনি ১৪ ই এপ্রিল মালয়লাম নববর্ষ 'বিশু' পালিত হয় কেরলে। যদিও এখানে সেপ্টেম্বর মাসে তথা ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের নবমীতে আরও একটা নববর্ষ 'ওনাম' পালিত হয়। রামনবমীর দিন নববর্ষ হয় রাজস্থানীদের। চৈত্র মাসের পূর্ণিমা তিথিতে নববর্ষ উদযাপন করা হয় অন্ধ্রপ্রদেশে। পয়লা চৈত্রতে নববর্ষ 'যুগাদি' পালন হয় কর্ণাটকে। তেমনি পয়লা অগ্রহায়ণে গুজরাটিরা নববর্ষ উদযাপন করে সবরমতী নদীর জলে প্রদীপ ভাসিয়ে। তবে বাঙালিদের মতোই পয়লা বৈশাখ নববর্ষ উদযাপন করে অসমীয়া এবং পাঞ্জাবিরা।

উত্তর ভারতে 'বিক্রম সংবত' তথা নববর্ষ হয় চৈত্রের শুক্লা প্রতিপদে। ওড়িশাতে চালু ছিল 'বিলায়তি' এবং 'আমলি' অব্দ। এই 'আমলি' শুরু হোতো ভাদ্র মাসের শুক্লা দ্বাদশীতে এবং 'বিলায়তি' হোতো আশ্বিন থেকে। দক্ষিণ কেরলে 'কোল্লাম' শুরু হয় ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা নবমীতে। দক্ষিণ ভারতের 'বার্হস্পত্য' শুরু হয় বৈশাখের কৃষ্ণা তিথি থেকে। বাংলা নববর্ষ উৎসব পালনের মূলে সম্রাট আকবর প্রতিষ্ঠিত 'নওরোজ' উৎসবের কথা অনেকেই বলেন। এটি পারস্যের বসন্ত উৎসব।

বাঙলার
বৈশাখের প্রথম দিন সাজানো হয়েছে কুলো।

নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ এই নববর্ষের নাম দিয়েছিলেন 'পুণ্যাহ'। আসলে রাজস্ব আদায় করে জমিদারদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য ছিলো তাঁর। তেমনি জমিদাররাও পয়লা বৈশাখ না করে অন্য কোনও দিন 'পুণ্যাহ' পালন করে খাজনা আদায় করতো প্রজাদের কাছ থেকে। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র 'পুণ্যাহ' করতেন অগ্রহায়ণের প্রথমে। কিন্তু নববর্ষ উদযাপন করতেন পয়লা বৈশাখ দিনটিতেই।

বাংলার কৃষি মানচিত্রেও নববর্ষের সংযোগ দেখতে পাই। খনার বচনে আছে "খনা বলে শুন কৃষকগণ / হাল লয়ে মাঠে যাবে যখন / শুভক্ষন দেখে করিবে যাত্রা / পথে যেন না হয় অশুভ বার্তা / আগে গিয়ে করো দিক নিরূপণ / পূর্বদিক হতে কর হল চালন / তাহা হলে তোর সমস্ত আশয় / হইবে সফল নাহিক সংশয়"। অর্থাৎ নববর্ষের শুভক্ষণ দেখে চাষ শুরু করতে হয়। কোনোরকম অশুভ দর্শন এক্ষেত্রে ক্ষতিকর হতে পারে। তখন ফিরে আসা উচিত। আর মাঠের পূর্ব দিক থেকে হাল করা উচিত । তবেই কৃষিতে সাফল্য আসবে। চাষিরা এই বচন মেনে চলেন আজও।

বাঙলার
তুলসীতলায় হয় 'বসনঝারা'। ছবিঃ ভাস্করব্রত পতি।

এখন আর সেই জমিদারগিরি নেই। আস্তে আস্তে নববর্ষ উৎসবটা চলে গিয়েছে ব্যবসায়ীদের হাতে। তবুও বাঙালি জাতি এইদিনে তাঁদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে এখনও বেরিয়ে আসতে চাইছেনা স্রেফ সংস্কৃতিমনস্ক মনটাকে বিসর্জন দিতে চায়না বলেই। যতই কোরোনা ভাইরাস চোখ রাঙাক, নববর্ষ বাঙালির কাছে আলাদা আবেগ, আলাদা ঐতিহ্য, আলাদা ভালোবাসা। এর মৃত্যু হয় না।

নববর্ষ মানেই পুরানো কালিমা আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া। যাবতীয় দুর্দশার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে নতুনকে বরণ করে নেওয়ার নামই নববর্ষ! এখানে থাকবে না কোনো দ্বেষ, লোভ, ক্ষোভ আর হিংসার বিষাক্ত ধোঁয়াশা! নববর্ষেই শপথ নিতে হয় আগামী দিনগুলোতে ঠিক কিভাবে পরিচালিত করবো নিজেকে! নববর্ষ মানেই বছরভর ভালো থাকার বর প্রার্থনা করা! "মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা / অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা "!


midnapore.in

(Published on 15.04.2021)