Eram, massacre, 1942, Rakta, Tirtha,  Basudevpur, Bhadrak, second, Jallianwala, Bagh


২৯ শহীদের রক্তে লেখা রক্ততীর্থ এরম


Rakta Tirtha Eram: The Forgotten Blood-Stained Chapter of India’s Freedom Struggle



অরিন্দম ভৌমিক।






২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪২। ওড়িশার এক প্রত্যন্ত গ্রাম—এরম। চারদিকে নদী, জলাভূমি ও সমুদ্রঘেরা সেই নির্জন প্রান্তরে সেদিন জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। তাঁদের হাতে ছিল লাঠি, মুখে স্বাধীনতার দাবি। আর সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে সেখানে পৌঁছল ব্রিটিশ সরকারের সশস্ত্র পুলিশবাহিনী।


তারপর যা ঘটেছিল, তা শুধু একটি পুলিশি গুলিচালনার ঘটনা নয়—ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়। কয়েক মিনিটের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন ২৯ জন মানুষ; আহত হয়েছিলেন আরও বহুজন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন এক নারী—পরী বেওয়া। আজও সেই মাটি তাই পরিচিত ‘রক্ততীর্থ এরম’ নামে।


রক্ততীর্থ এরম : স্বাধীনতার জন্য রক্তে লেখা এক বিস্মৃত ইতিহাস


১৯৪২ সালের আগস্টে মহাত্মা গান্ধীর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার পর ওড়িশার বালেশ্বর অঞ্চলেও আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। বর্তমান ভদ্রক জেলার বাসুদেবপুর অঞ্চলের প্রত্যন্ত এরম তখন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ প্রশাসনের পক্ষে দুর্গম এই অঞ্চলে স্থানীয় মানুষের সংগঠন ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছিল।


১৯২০ সাল থেকে এরম ছিল উৎকল কংগ্রেসের সভা-সমিতির একটি গোপন স্থান। গোপবন্ধু দাস, হরেকৃষ্ণ মহতাব এবং অন্যান্য কংগ্রেস নেতারা এরমকে জনসভা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে ব্যবহার করতেন। সেখানে তাঁরা অসহযোগ আন্দোলন ও ভারত ছাড়ো আন্দোলন সম্পর্কে মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতেন।


Eram, massacre, 1942, Rakta, Tirtha,  Basudevpur, Bhadrak, second, Jallianwala, Bagh
২৯ শহীদের রক্তে লেখা রক্ততীর্থ এরম । Eram: The Sacred Land of 29 Martyrs

এরমের মেলন মাঠে সভা-সমাবেশ হচ্ছিল। ২৮ সেপ্টেম্বর সেখানে বিপুল মানুষের সমাবেশ হয়। বিভিন্ন সরকারি ও ঐতিহাসিক সূত্রে সমাবেশের সংখ্যা প্রায় ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ বা তারও বেশি বলা হয়েছে—সংখ্যায় কিছু পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: সেদিন মাঠটি হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।


শঙ্খধ্বনিতে ছড়িয়ে পড়েছিল খবর


সেদিন পুলিশবাহিনী এরমের দিকে এগিয়ে আসার খবর ছড়িয়ে পড়ে শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে। প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে শঙ্খের শব্দ ছিল বিপদের সংকেত। ওড়িশা সরকারের ইতিহাসভিত্তিক বিবরণে বলা হয়েছে, পুলিশ নদী পেরিয়ে এগিয়ে আসতেই মানুষের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল জনসমাগম ঘটে।


ব্রিটিশ প্রশাসনের উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনের নেতাদের গ্রেফতার করা এবং অঞ্চলটির উপর পুনরায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। বাসুদেবপুর থেকে ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ কুঞ্জবিহারী মহান্তি-র নেতৃত্বে সশস্ত্র পুলিশবাহিনী এরমের দিকে যায়। সরকারি ঐতিহাসিক বিবরণে পুলিশ দলের সঙ্গে ১৮ জন সশস্ত্র কনস্টেবল ও অন্যান্য পুলিশকর্মীর উপস্থিতির কথা উল্লেখ আছে।


তারপর শুরু হল গুলি


এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়।


পুলিশ ও জনতার মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। সরকারি ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, পুলিশ দলের সঙ্গে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং পুলিশের দিকে জনতা এগিয়ে আসতে থাকে। এরপর পুলিশ গুলি চালায়। একটি ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, ১২৯টি রাইফেলের গুলি ও ১৪টি রিভলভারের গুলি চালানো হয়েছিল।


অন্য একটি ওড়িশা রিভিউ-র বিবরণে মোট ৩০৪টি গুলি ছোড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ গুলির সংখ্যার বিষয়ে সমকালীন ও পরবর্তী বিভিন্ন বিবরণে পার্থক্য আছে; তবে বিপুল সংখ্যক গুলি চালানো এবং ব্যাপক প্রাণহানির বিষয়টি একাধিক সূত্রে স্পষ্ট।

Eram, massacre, 1942, Rakta, Tirtha,  Basudevpur, Bhadrak, second, Jallianwala, Bagh
২৯ শহীদের রক্তে লেখা রক্ততীর্থ এরম । Eram: The Sacred Land of 29 Martyrs

মাঠটির তিন দিক ছিল অপেক্ষাকৃত বন্ধ। ফলে গুলির মুখে পড়ে বহু মানুষ সহজে বেরিয়ে যেতে পারেননি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মাটিতে পড়ে রইল একের পর এক নিথর দেহ।


২৮ না ২৯—শহিদের সংখ্যা নিয়ে কেন পার্থক্য?


এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিষয় মনে রাখা দরকার।


ভদ্রক জেলা প্রশাসনের সরকারি পর্যটন পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ২৮ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং আহত ৫৬ জনের মধ্যে আরও একজন পরে মারা যান—অর্থাৎ মোট ২৯ জন।


অন্যদিকে ওড়িশা সরকারের একটি ঐতিহাসিক নথিতে সরাসরি ২৯ জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে।


তাই ২৯ জন শহিদের সংখ্যাটিই পরবর্তী সরকারি ও ঐতিহাসিক বিবরণে বহুল স্বীকৃত, যদিও কোথাও ২৮ জন ঘটনাস্থলে নিহত এবং পরে একজনের মৃত্যুর হিসাব আলাদা করে দেওয়া হয়েছে।


পরী বেওয়া—এরমের রক্তাক্ত ইতিহাসে এক নারী শহিদ


এই হত্যাযজ্ঞের শহিদদের মধ্যে ছিলেন পরী বেওয়া।


তিনি শুধু এরমের ইতিহাসেই নন, ওড়িশার স্বাধীনতা সংগ্রামের নারী অংশগ্রহণের ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ওড়িশা সরকারের প্রকাশিত ইতিহাসভিত্তিক লেখাগুলিতে তাঁকে ওড়িশার প্রথম নারী শহিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।


ভাবতে অবাক লাগে—স্বাধীনতার দাবিতে যে আন্দোলনে গ্রামের সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন, সেখানে একজন সাধারণ নারীও প্রাণ দিয়েছিলেন। তাঁর রক্ত প্রমাণ করে, স্বাধীনতার লড়াই কেবল শহরের শিক্ষিত পুরুষদের লড়াই ছিল না; গ্রামের নারী-পুরুষ, কৃষক-শ্রমিক—সাধারণ মানুষও সেই সংগ্রামের অংশ হয়েছিলেন।


২৯টি নাম—একটি জাতির ঋণ


ভদ্রক জেলা প্রশাসনের নথিতে এরমের শহিদদের তালিকা সংরক্ষিত রয়েছে। সেখানে পরী বেওয়ার পাশাপাশি রয়েছেন বিশ্বনাথ দাস, গোপালচন্দ্র দাস, বিজুলি দাস, হৃষিকেশ বেহেরা, মদন পাল্লাই, বাসুদেব সাহু, রামা মাঝি, কৃষ্ণ স্বাইন, ভুবন/ভুয়া মাঝি, ক্রুপাসিন্ধু, মণি প্রধান, রত্নাকর পানি, গোবিন্দ রাউত-সহ বহু সাধারণ মানুষ।


এঁদের অনেকের নাম আজ জাতীয় ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে নেই। কিন্তু স্বাধীনতার ইতিহাস কি শুধু বিখ্যাত নেতাদের নামেই সম্পূর্ণ হয়?


যে মাটিতে সাধারণ মানুষ রক্ত দিয়েছেন, সেই মাটির ইতিহাসও তো ভারতের ইতিহাস।


জালিয়ানওয়ালাবাগের সঙ্গে তুলনা কেন?


১৯১৯ সালের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম পরিচিত রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৪২-এর এরমের ঘটনায়ও একটি বৃহৎ জনসমাবেশের উপর পুলিশ গুলি চালায় এবং বিপুল প্রাণহানি ঘটে। সেই কারণেই ওড়িশার সরকারি ও ঐতিহাসিক বিবরণে এরমকে ‘দ্বিতীয় জালিয়ানওয়ালাবাগ’ বলা হয়েছে।


তবে দুটি ঘটনার পরিস্থিতি এক ছিল না। জালিয়ানওয়ালাবাগে ১৯১৯ সালে জেনারেল ডায়ারের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সেনা গুলি চালিয়েছিল; এরমে ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের পুলিশ বাহিনী গুলি চালায়। ইতিহাসের তুলনাটি মূলত বৃহৎ জনসমাবেশের উপর প্রাণঘাতী গুলিচালনা ও ব্যাপক প্রাণহানির কারণে।


শুধু মৃত্যু নয়—প্রতিরোধের ইতিহাসও


এরমের ইতিহাসকে কেবল ‘একটি massacre’ হিসেবে দেখলে তার সম্পূর্ণ তাৎপর্য বোঝা যায় না।


১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে ওড়িশার বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিলেন। এরম ছিল সেই বৃহত্তর গণপ্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ইতিহাসবিদ Biswamoy Pati তাঁর গবেষণায় এরমের ঘটনাকে ওড়িশার Quit India আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন এবং ১৯৪২ সালের গুলিচালনা সম্পর্কে তৎকালীন Joint Enquiry-র রিপোর্টেরও উল্লেখ করেছেন।


অর্থাৎ এরমের রক্ত শুধু একটি মাঠকে রাঙায়নি—তা দেখিয়েছিল, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতেও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কত গভীরে পৌঁছে গিয়েছিল।


আজও কেন ‘রক্ততীর্থ’?


‘তীর্থ’ শব্দটি সাধারণত পবিত্রতার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু এরমের ক্ষেত্রে ‘রক্ততীর্থ’ নামটি এসেছে শহিদদের রক্তে পবিত্র হয়ে ওঠা সেই মাটির স্মৃতি থেকে।

Eram, massacre, 1942, Rakta, Tirtha,  Basudevpur, Bhadrak, second, Jallianwala, Bagh
২৯ শহীদের রক্তে লেখা রক্ততীর্থ এরম । Eram: The Sacred Land of 29 Martyrs

আজ সেখানে শহিদ স্মারক রয়েছে এবং ওড়িশা সরকার এরমকে ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভদ্রক জেলা প্রশাসনের সরকারি পর্যটন পৃষ্ঠায় স্থানটির নামই দেওয়া হয়েছে “Eram (Raktatirtha)”।


১৯৪২-এর সেই বিকেলে যারা গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই হয়তো জানতেন না স্বাধীনতা কবে আসবে। তাঁরা জানতেন না তাঁদের নাম ভবিষ্যতের ইতিহাসে লেখা হবে কি না।


তবু তাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন।


কারণ স্বাধীনতা কখন আসবে—তা তাঁরা জানতেন না;


কিন্তু স্বাধীনতা আসবেই—এই বিশ্বাস তাঁদের ছিল।


২৮ সেপ্টেম্বর তাই শুধু একটি তারিখ নয়।


এটি ২৯টি জীবনের স্মৃতি, একটি নারীর আত্মত্যাগ, হাজার মানুষের প্রতিরোধ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের সাধারণ মানুষের অদম্য আকাঙ্ক্ষার দিন।


আজ যখন আমরা স্বাধীন ভারতের নাগরিক হিসেবে স্বাধীনভাবে কথা বলি, চলি, ভোট দিই, নিজের মত প্রকাশ করি—তখন এরমের সেই রক্তাক্ত মাঠের কথা মনে রাখা আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব।


কারণ স্বাধীনতা শুধু দিল্লির লালকেল্লায় অর্জিত হয়নি—


স্বাধীনতার পথ তৈরি হয়েছিল এরমের মতো অজস্র অখ্যাত গ্রামের মানুষের রক্তে।


● Pari Bewa, Eram, Basudebpur


● Gopal Chandra Das, Padhnuan


● Bishwanath Das, Padhuan


● Bijuli Das, Padhuan


● Hrushikesh Behera, Padhuan


● Madan Palai, Padhuan


● Ballahaba Behera, Padhuan


● Magha Mahalika, Padhuan


● Bhua Majhi, Padhuan


● Kali Ajhi, Padhuan-Kumarpur


● Radhu Ahalika, Padhuan-Muladiha


● Dhruba Charana Dey, Padhuan


● Basudeb Sahu, Padhuan


● Hari Behera, Padhuan


● Dibakar Panigrahi, Guda-Kesagadia


● Krushna Chandra Swain, Padhuan-Kumarpur


● Bhaban Rout, Padhuan-Nandapura


● Nidhi Mahalika, Padhuan


● Brundaban Panda, Padhuan


● Upa Mallika, Nuangan


● Krupasindhu Behera, Sankharu


● Rama Majhi, Padhuan-Kumarpur


● Mani Behera, Padhuan


● Kati Sahu, Iswarapur


● Ratnakar Pani, Sudarsanpur


● Mani Pradhana, Suan-Sudarsanpur


● Pari Das, Suan


● Sankar Mallika, Adhunan


● Gobinda Rout, Artungan


ইরম ওড়িশার ভদ্রক জেলায় অবস্থিত এবং এটি ভদ্রক জেলার বাসুদেবপুর গ্রাম থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ইরম বঙ্গোপসাগর, গামোই ও কংসবাঁশ নদী এবং ঘন জঙ্গল দিয়ে ঘেরা।




M E D I N I K A T H A J O U R N A L

Edited by Arindam Bhowmik

Published on 28.09.2026



তথ্যসূত্র:-

● District Administration, Bhadrak, Government of Odisha — “Eram (Raktatirtha)”
● Odisha Virtual Academy — Reflections on the National Movement in Orissa; এরমের গুলিচালনা, পুলিশবাহিনী ও হতাহতের বিবরণ।
● Government of Odisha, Bhadrak — Eram Incident; শহিদদের তালিকা ও ঘটনার সরকারি বিবরণ।
● Odisha Review — August 2014, এরমের ঘটনা ও ২৯ শহিদের তালিকা।
● Biswamoy Pati, “The climax of popular protest: The Quit India Movement in Orissa”, Indian Economic & Social History Review (1992); এরম ফায়ারিং ও Joint Enquiry Report-এর উল্লেখ।
● Odisha Review — Government of Odisha, Quit India Movement ও এরমের শহিদ পরী বেওয়া সম্পর্কে আলোচনা।