২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩০—দিনটি হয়তো ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে পরিচিত তারিখগুলির একটি নয়। কিন্তু মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম চিরনের সেদিন দেখেছিল এমন এক রক্তাক্ত অধ্যায়, যেখানে বন থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের অধিকার রক্ষার দাবিই পরিণত হয়েছিল ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের এক সাহসী অধ্যায়ে।
যে জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়েছিলেন, সেখানেই রক্তে লেখা হয়েছিল স্বাধীনতার ইতিহাস
১৯৩০ সাল। সারা ভারত তখন মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স বা আইন অমান্য আন্দোলনের ঢেউয়ে উত্তাল। লবণ আইন ভাঙার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ ব্রিটিশ সরকারের অন্যায় আইন ও বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনে নামছিলেন।
১৯৩০ চিরনের জঙ্গল সত্যাগ্রহ ও ১৪ শহিদের স্মৃতি।
মহারাষ্ট্রের পানভেলের কাছে রায়গড় জেলার চিরনের গ্রামেও সেই আন্দোলনের ঢেউ পৌঁছেছিল। স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা জঙ্গলে ব্রিটিশ সরকারের বিধিনিষেধ তাঁদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে জঙ্গল থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের অধিকার নিয়ন্ত্রণ করেছিল ঔপনিবেশিক প্রশাসন। এই অন্যায়ের প্রতিবাদেই শুরু হয় চিরনের জঙ্গল সত্যাগ্রহ। ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রকের Dictionary of Martyrs: India’s Freedom Struggle (1857–1947)-এ ঘটনাটিকে ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩০-এর সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স আন্দোলনের অংশ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
২৫ সেপ্টেম্বর—আক্কাদেবীর পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চলেছিল জনস্রোত
সেদিন চিরনের জঙ্গলের কাছে আক্কাদেবীর ময়দানে বিপুল সংখ্যক মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। স্থানীয় কৃষক, শ্রমজীবী ও বননির্ভর মানুষের পাশাপাশি আশপাশের গ্রামের মানুষও সত্যাগ্রহে যোগ দেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল অন্যায় বন-আইন অমান্য করে নিজেদের প্রাকৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
১৯৩০ চিরনের জঙ্গল সত্যাগ্রহ ও ১৪ শহিদের স্মৃতি।
সরকারি নথিভুক্ত বিবরণে জানা যায়, আন্দোলনকারীরা জঙ্গলে গিয়ে আইন অমান্য করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি শুধুমাত্র কাঠ সংগ্রহের প্রশ্ন ছিল না—এটি ছিল তাঁদের জীবনযাপন ও অধিকার রক্ষার প্রশ্ন।
কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসন এই গণআন্দোলনকে সহ্য করেনি।
পুলিশ আন্দোলনকারীদের আটক করতে শুরু করে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আর তারপর—
বেজে উঠল বন্দুক।
নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের উপর শুরু হল গুলি।
একটি গুলিবর্ষণ, আর চিরনের মাটিতে একসঙ্গে ঝরে পড়ল বহু প্রাণ
ভারত সরকারের Dictionary of Martyrs অনুযায়ী, পুলিশের গুলিতে চিরনের এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের মোট ১৪ জন মানুষ নিহত হন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ঘটনাস্থলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
তাঁদের মধ্যে ছিলেন—
● ধাকু গাভল্যা ফোফেরকর
● রঘুনাথ মোরেশ্বর শিন্ডে
● পরশুরাম রামা পাটিল
● হসুরাম বুধাজি ঘরত
● আলু বেমট্যা মাত্রে প্রমুখ।
সরকারি নথিতে আলু বেমট্যা মাত্রের সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি ২৫ সেপ্টেম্বর আক্কাদেবীর ময়দানে অনুষ্ঠিত আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন এবং পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে সেখানেই প্রাণ হারান।
১৯৩০ চিরনের জঙ্গল সত্যাগ্রহ ও ১৪ শহিদের স্মৃতি।
আর একজন শহিদের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়—নাগ্যা মহাদেও কাটকারি। তাঁর নাম পরবর্তী সময়ে চিরনের শহিদ স্মৃতিতে যুক্ত হয় এবং তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যেও তাঁর স্মৃতি বিশেষভাবে সংরক্ষিত হয়েছে।
কেন তাঁরা লড়েছিলেন?
চিরনের জঙ্গল সত্যাগ্রহকে শুধু একটি স্থানীয় বন-আইন বিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যায় না।
১৯৩০ চিরনের জঙ্গল সত্যাগ্রহ ও ১৪ শহিদের স্মৃতি।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে বনাঞ্চলের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ কঠোর করা হয়েছিল। অথচ স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা বহুদিন ধরে জঙ্গলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। জ্বালানি কাঠ, ঘাস এবং অন্যান্য বনজ সম্পদের উপর তাঁদের দৈনন্দিন জীবন নির্ভর করত।
তাই তাঁদের কাছে বন ছিল শুধু সরকারি সম্পত্তি নয়—জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই অধিকার যখন ঔপনিবেশিক আইন দ্বারা সংকুচিত করা হল, তখন প্রতিবাদও হয়ে উঠল স্বাভাবিক। চিরনের মানুষ সেই প্রতিবাদকে যুক্ত করলেন ১৯৩০-এর সর্বভারতীয় আইন অমান্য আন্দোলনের সঙ্গে।
শহিদদের স্মরণে সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছিল। স্থানীয় ইতিহাসের নথি অনুযায়ী, ব্রিটিশ প্রশাসন পরবর্তীকালে সেই স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে যেমন গুলি করে শেষ করা যায়নি, তেমনই স্মৃতিও মুছে ফেলা যায়নি।
১৯৩০ চিরনের জঙ্গল সত্যাগ্রহ ও ১৪ শহিদের স্মৃতি।
১৯৩৯ সালে স্থানীয় উদ্যোগে স্মৃতিস্তম্ভটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীকালে পুরনো স্মৃতিস্তম্ভের কিছু ধ্বংসাবশেষও উদ্ধার করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। আজ সেই স্থান চিরনের হুতাত্মা স্মারক হিসেবে পরিচিত।
প্রতি বছর ২৫ সেপ্টেম্বর সেখানে শহিদদের স্মরণ করা হয়। সরকারি মর্যাদায় শ্রদ্ধা নিবেদন এবং পুলিশের বন্দুকের স্যালুটের মাধ্যমে স্মরণ করা হয় সেইসব মানুষকে, যাঁরা ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
চিরনের শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক
স্বাধীনতার ইতিহাস আমরা যখন স্মরণ করি, তখন সাধারণত দিল্লি, কলকাতা, মুম্বই, চট্টগ্রাম, লাহোর কিংবা দান্ডির মতো বড় বড় কেন্দ্রের কথা উঠে আসে। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু বড় শহরের ইতিহাস নয়।
তার একটি বিশাল অংশ লুকিয়ে আছে—
ছোট ছোট গ্রামে,
জঙ্গলের পথে,
কৃষকের কুঁড়েঘরে,
অখ্যাত মানুষের জীবনে।
চিরনের জঙ্গল সত্যাগ্রহ সেই বিস্মৃত ইতিহাসেরই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
যাঁরা সেদিন জঙ্গলে গিয়েছিলেন, তাঁরা হয়তো জানতেন না তাঁদের নাম একদিন ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে। তাঁরা জানতেন না তাঁদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে একদিন স্বাধীন ভারত জন্ম নেবে।
তাঁরা শুধু জানতেন—
অন্যায়কে মেনে নেওয়া যাবে না।
আর তাই ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩০-এ চিরনের মাটিতে যখন গুলি চলেছিল, তখন শুধু কয়েকজন মানুষের প্রাণ যায়নি—
ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে আরও কয়েকটি অমর নাম যুক্ত হয়েছিল।
আজ ২৫ সেপ্টেম্বর তাঁদের স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়।
১৯৩০ চিরনের জঙ্গল সত্যাগ্রহ ও ১৪ শহিদের স্মৃতি।
এটি মনে রাখা যে ভারতের স্বাধীনতা কোনও একক নেতা, একক শহর বা একক আন্দোলনের অর্জন ছিল না।
অসংখ্য পরিচিত ও অখ্যাত মানুষের রক্ত, ত্যাগ এবং প্রতিবাদের সম্মিলিত ফল ছিল স্বাধীনতা।
চিরনের সেই বন আজও যেন প্রশ্ন করে—
“যে স্বাধীনতার জন্য আমরা প্রাণ দিয়েছিলাম, তোমরা কি সেই ইতিহাস মনে রেখেছ?”
M E D I N I K A T H A J O U R N A L
Edited by Arindam Bhowmik
Published on 25.09.2026
তথ্যসূত্র:-
● Government of India, Ministry of Culture — Dictionary of Martyrs: India’s Freedom Struggle (1857–1947), Vol. III — চিরনের জঙ্গল সত্যাগ্রহ, ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩০ এবং পুলিশের গুলিতে ১৪ জনের মৃত্যুর তথ্য।
● Ministry of Culture — Digital District Repository, Azadi Ka Amrit Mahotsav — চিরনের জঙ্গল সত্যাগ্রহ, আলু বেমট্যা মাত্রে এবং স্থানীয় আন্দোলনের বিবরণ।
● Government of India, Ministry of Culture — Dictionary of Martyrs, Vol. III — আলু মাত্রে, পরশুরাম রামা পাটিল, রঘুনাথ মোরেশ্বর শিন্ডে প্রমুখ শহিদের তথ্য।
● Raigad historical record — Chirner Hutatma Smarak ও স্মৃতিস্তম্ভ পুনর্নির্মাণের বিবরণ।
● একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত সতর্কতা: বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিবেদনে শহিদের সংখ্যা ১৩ বা ১৪—দুইভাবেই উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রকের Dictionary of Martyrs–এর সরকারি নথিতে চিরনের ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের ১৪ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাই প্রামাণ্য ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে আমি ১৪ সংখ্যাটিই ব্যবহার করেছি।