পাথরকাটির মা জয়চন্ডী
লোধাজাতির দেহরি পূজা করেন ৩৬৫ দিন, ব্রাহ্মণ পুরোহিতকে ছাড় মাত্র চারদিনের।
চিন্ময় দাশ।
Home » Medinikatha Journal » Chinmoy Das » পাথরকাটির মা জয়চন্ডী
কথামুখ
সমগ্র সাঁকরাইল থানার এক প্রাচীন ও বিশিষ্ট দেবভূমি হল পাথরকাটির প্রান্তর। সেখানেই বিরাজ করেন দেবী জয়চন্ডী। আদিম জনগোষ্ঠী লোধা সম্প্রদায়ের একান্ত নিজস্ব দেবী তিনি। পূজকের আসনে বসেন একজন লোধা পুরোহিত। তাঁকে বলা হয়—দেহরি। কিন্তু ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে, সমস্ত সম্প্রদায়ের আরাধ্যা এই দেবী। কেবল সাঁকরাইল থানা নয়, দেবী জয়চন্ডীর প্রভাব মন্ডল কেশিয়াড়ি, খড়গপুর, ঝাড়গ্রাম ইত্যাদি কয়েকটি থানার একটি বিস্তৃত জনপদ জুড়ে বিস্তৃত।
পাথরকাটির মা জয়চন্ডী।
১৬ নং জাতীয় সড়ক মুম্বাই রোড। সেই রাজপথের উপর বসতি করেন ‘মা গুপ্তমণি’ নামে বহু খ্যাত এক লোকদেবী। মায়ের মন্দির থেকে বন-জঙ্গল ভেদ করে একটি পথ গিয়েছে দক্ষিণ মুখে। সাপের মতো আঁকাবাঁকা গতিতে সেই পথ গিয়ে থেমেছে সুবর্ণরেখা নদীর জল ছুঁইয়ে।
সেই পথের সামান্য দূরে, ২য় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত একটি এয়ারফিল্ড (বিমানক্ষেত্র) দুধকুণ্ডি। তারই কাছাকাছি একটি আর্টেজীয় প্রস্রবন থেকে উৎপত্তি হয়েছে পাহাড়ি নদী কেলেঘাই-এর। এমনই এক পরিমণ্ডলে অবস্থান করেন মা জয়চণ্ডী নামে এক লোকদেবী।
দেবীর আবির্ভাব নিয়ে কিংবদন্তি
এখানে দেবী জয়চন্ডীর আবির্ভাব কীভাবে হলো, তা নিয়ে লোকমুখে কয়েকটি কাহিনী শোনা যায়। তেমনই দুটি কিংবদন্তির উল্লেখ করবো আমরা।
১. মৌজার নাম পাথরকাটি। জে. এল. নং ১৩৪। দিগপারুই পরগণার এই মৌজাটি আয়তনে বেশ ছোটই। পরিমাণ ফল মাত্র ৩৯৪ একর। ইংরেজ শাসন থেকে সাঁকরাইল থানার অধীনস্থ হয়েছে জনপদটি।
মুম্বাই রোড ছেড়ে, পাকারাস্তা যখন বাকড়া চকে পৌঁছালো, সেখানেই পাথরকাটি গ্রাম। অধিকাংশই আদিবাসী এবং অভাবী নিম্নবর্গীয় মানুষজনের বসবাস। কয়েক পা হেঁটে, গ্রামের জনবসতি এলাকা শেষ। তার বাইরে একটি তপোবন তুল্য স্থান। বিশাল বিশাল একেবারে মহীরুহের তুল্য নিম, অশ্বত্থ, কুচিলা আর কেলিকলম্ব গাছের সমাবেশ।
লোধা সম্প্রদায়ের লোকজন বলে থাকেন, একবার রাম প্রামাণিক নামে পার্শ্ববর্তী তালাই গ্রাম (মৌজা নং-- ১৩৩)-এর লোধা সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি, পাথরকাটি গ্রামের জঙ্গলে শিকার করতে গিয়েছিলেন। সারাদিন ঘোরাঘুরির পর ক্লান্ত হয়ে, একটি কেলিকদম্ব গাছের তলায় ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। সেই সময় তিনি এক দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে, সেখানেই একটি গাছের তলা খুঁড়ে, একটি মূর্তি উদ্ধার করেছিলেন।
আজও মন্দিরে দেবীর যে বিগ্রহটি পূজিত হন, এটি সেই মূর্তি। রাম প্রামাণিক মূর্তিটি উদ্ধার করে, সেখানেই প্রতিষ্ঠা এবং পূজা শুরু করেছিলেন। নিজেই ছিলেন দেবীর পুরোহিত। স্থানীয় ভাষায় যার যাঁর নাম—দেহরি। সেদিন থেকে লোধা জাতিভুক্ত রাম প্রামাণিক এবং তাঁর পরবর্তী বংশধরগণই দেবীর পূজা বা দেহরির অধিকার ভোগ করে আসছেন।
২. দেবীর উদ্ভব সম্পর্কে দ্বিতীয় অভিমত-- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, অধ্যাপক প্রবোধকুমার ভৌমিক মহাশয়, কিংবা রোহিনী গ্রামের শিক্ষক সত্যেন সড়ঙ্গী মহাশয় প্রমূখ ভিন্ন একটি কাহিনী বলে গিয়েছেন।
পাথরকাটির মা জয়চন্ডী।
সেটি হল: ময়ূরভঞ্জ এলাকা থেকে নন্দরাম মাহাতো নামে কুড়মি সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির মহিষ হারিয়ে গিয়েছিল। সেই হারানো মহিষের সন্ধানে, সাত দিন যাবৎ বনজঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত অবস্থায়, পাথরকাটির এই প্রান্তরে এসে পড়েছিলেন নন্দরাম। সেসময় এক বৃক্ষতলে ঘুমে ঢলে পড়লে, এক মধ্যবয়স্কা রমণীর রূপ ধরে, দেবী জয়চন্ডী তাঁর সামনে আবির্ভূত হন এবং একটি মন্দির নির্মাণ করে দেবীর প্রতিষ্ঠা এবং পূজা প্রকাশ করবার আদেশ দেন।
ঘুম থেকে জেগে উঠে, নন্দরাম সেখানেই তাঁর হারানো মহিষটিকে খুঁজে পান। বিস্মিত নন্দরাম ময়ূরভঞ্জ থেকে নিজের সম্প্রদায়ের লোকজনকে এনে, সেখানেই মন্দির প্রতিষ্ঠা এবং দেবীর পূজার প্রচলন করেন।
কিন্তু দেবীর উদ্ধার এবং তাঁর পূজা প্রচলন করে, দূরান্তরে থাকা যায় না। সেকারণে, নন্দরাম তাঁর নিজের পরিবার এবং পাড়াপ্রতিবেশীদের নিয়ে পাথরকাটির গ্রামে উঠে এসে স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করেছিলেন।
দেবী চণ্ডী বিষয়ে বিশ্ববোধ
দেবী চণ্ডীর আরাধনা যে বহু প্রাচীনকালের, তা আমরা সকলেই জানি। ‘ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ’-এ শক্তি দেবীর নামের যে উল্লেখ আছে, তার একটি বর্ণানুক্রমিক তালিকা করা যেতে পারে—অম্বিকা, কালিকা, গৌরী, চন্ডী, দুর্গা, নারায়ণী, পার্বতী, ভগবতী, সতী, সনাতনী, সর্বাণী, সর্বমঙ্গলা ইত্যাদি।
বলা হয়, অতীতকালে বাণিজ্যযাত্রার মাধ্যমে বাঙালি বণিকের দল অষ্টাদশ ভূজা দেবী উগ্রচন্ডী দুর্গার আরাধনার রীতি, জাভা, শ্যাম, কম্বোজ, চীন, কোরিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জ সুমাত্রা, বালি, বোর্ণিও, সেলিব্রেশ এবং ফিলিপাইন দ্বীপসমূহে বহন করে নিয়ে গিয়েছিলেন।
পাথরকাটির মা জয়চন্ডী।
পমবনম নামক জায়গাতেই কমপক্ষে ১০০০ চন্ডীমন্দির আছে, যেগুলি ইংরেজি পনের শতকের পূর্বকাল থেকে নির্মিত হয়েছিল। এ থেকেই অনুমিত হয়, পূর্বকালে দেবী চণ্ডীর প্রভাব কী বিপুল ভাবে ব্যপ্ত হয়েছিল।
এই সকল দূর দেশের কথা বাদ দিলেও, আমাদের মূল ভূখণ্ডে দেখা যায়, সেই কোন আদিকাল থেকে এই দেবী চণ্ডী ভিন্ন ভিন্ন নামে অনার্য সম্প্রদায়ের আরাধ্যা দেবী হিসেবেও পুজিত হয়ে আসছেন।
ছোটনাগপুরের ওঁরাও সম্প্রদায়ের কাছে তিনি শিকারের দেবী। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কাছে তিনি মাতৃদেবী জাহের এরা। অন্যান্য দ্রাবিড় জনজাতির কাছে তাঁর নাম-- বনচন্ডী।
মেদিনীপুর জেলার নিম্নবর্গীয় হিন্দু সমাজে তিনি ‘বড়ামচন্ডী’ হিসেবে পূজিত হন। উদাহরণ হিসাবে, মেদিনীপুর জেলা শহরের কথা বলা যায়। শহরের প্রায় প্রতিটি রাস্তার মোড়েই বড়াম ঠাকুরের উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। কেবল অন্তজ সম্প্রদায়ই নয়, উচ্চতর বর্ণ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজনও এই দেবীর পূজা করে থাকেন। রাজ্যের অন্য কোনও শহরে এমন দৃষ্টান্ত দেখা যায় না।
গ্রাম-গ্রামান্তরের লোকসমাজে ঢেলাইচন্ডী, ওলাইচণ্ডী ইত্যাদি নামেও সাতজন চণ্ডীর অবস্থান আছে। পাথরঘাটি গ্রামের এই দেবীর নাম-- জয়চন্ডী।
পাথরকাটির মন্দির
পাথরকাটি গ্রামে যে মন্দিরে দেবীর পূজা হচ্ছে, সেটি একটি তিন দুয়ারী দালান-রীতির মন্দির। যতদূর জানা যায়, পূর্বকালে মাকড়া পাথরের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা একটি প্রাঙ্গণের মধ্যে দেবীর একটি উন্মুক্ত স্থান ছিল। বাংলা ১৩৩৪ সনে এই জেলার বেলিয়াবেড়া পরগনার জমিদারবাবু বিশ্বম্ভর প্রহরাজ মাকড়া পাথরে তৈরি এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন। সেই হিসেবে মন্দিরটি শতবর্ষ পূর্ণ করতে আর মাত্র দু'বছর বাকি।
মন্দিরের একেবারে সামনে, একটি তিন-দুয়ারী অলিন্দ। সেটির পিছনে গর্ভগৃহে একটিই দ্বারপথ। গর্ভগৃহের অভ্যন্তরে একটি আয়তাকার বেদী। তার উপর দেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। মূর্তিটি ভগ্ন। দেখতে অনেকখানি দেবী দুর্গার দেহকাণ্ডের নিম্নাংশের মতো।
পাথরকাটির মা জয়চন্ডী।
মূল বিগ্রহটিতে রুপার তৈরি চোখ মুখ এবং নাক বসানো হয়েছে। দেবীর পরিধানে উজ্জ্বল লাল রঙের পট্টবস্ত্র। অনুমান করা হয়, এগুলি লোধা দেহরির কাজ। এই মূর্তির দু’দিকে কদাকার দর্শন অন্য দুটি মূর্তি আছে। সেগুলিকে গণেশ এবং লক্ষী দেবী হিসেবে পূজা করা হয়।
মন্দিরের সামনে একটি উন্মুক্ত বিশাল প্রান্তর। সেখানে মন্দিরের একেবারে সামনে, একটি কেলিকদম্ব গাছের তলায়, দুটি হাড়িকাঠ পোঁতা আছে। ছোটটি ছাগল কিংবা ভেড়া বলির জন্য। বড় হাড়িকাঠটি কেবল মহিষ বলিদানের সময় ব্যবহার করা হয়।
আরো একটি লক্ষণীয় বিষয় এখানে উল্লেখ করতে হয়। দেবীর বিগ্রহের দক্ষিণ দিকে বিশাল আকারের একটি টেরাকোটার তৈরি হাতি দেখা যায়। সেটির উচ্চতা ছাড়িয়ে গিয়েছে দেবীর মস্তককে। ‘ছলন’ হিসেবে নিবেদিত হাতিটি তেল সিঁদুরের চর্চিত। দেহরির কাছে জানা যায়, পূর্বকালে বড় আকারের টেরাকোটার দুটি ঘোড়াও এই বেদীতে রাখা ছিল।
দেবীর বিগ্রহটির দিকে একবার দেখা যাক। গাঢ় কালো রঙের পাথরে খোদাই করা মূর্তি। হাতির পিঠে উপবিষ্ট। এটিকে প্রাচীনকালের কোনও মূর্তির একটি ভগ্ন খন্ড বলেই অনুমান করা হয়। তেল সিঁদুর লেপনের ফলে, মূর্তিতে দেহাবয়বের অধিকাংশই অস্পষ্ট। তবে, মূর্তিটির একেবারে বামদিকে নিচের অংশ নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে, অত্যন্ত দক্ষ হাতের সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখতে পাওয়া যায়। এই কাজগুলি করা হয়েছে পাথরের উপর বা-রিলিফ রীতিতে খোদাই করে।
‘বা-রিলিফ’ - স্থাপত্য-রীতির এক অনন্য ধারা
রিলিফ-রীতিতে খোদাই করে শিল্প সৃষ্টি করবার পদ্ধতি, বহু প্রাচীন কাল থেকে সারা বিশ্বজুড়ে প্রচলিত। এটির উৎপত্তি হয়েছে একটি ল্যাটিন ক্রিয়াবাচক শব্দ থেকে। যার অর্থ হিসাবে, ইংরেজিতে এবং বাংলায় বলা হয়-- উত্তোলন করা বা উঁচু করা। কোনও শিল্পকর্মকে ভূমি থেকে উত্তোলিত করে নির্মাণ করবার কৌশল দেখানোর জন্য, এই রীতির আশ্রয় নেওয়া হয়।
পাথরকাটির মা জয়চন্ডী।
দু’টি রীতিতে এটি করে তোলা যায়-- ভূমির ওপর উত্তোলিত করে, কিংবা ভূমিকেই খোদাই করে নিম্নাশ্রয়ী করে। এই দ্বিতীয় রীতির কাজ হয় পাথর কিংবা কাঠের উপর। পাথর বা কাঠের উপরিতলকে খোদাই করা হয়। তাতে ভিত্তিভূমিটি নিচু হয়ে যায় এবং অখোদিত মূল অংশটি উঁচু হয়ে ফুটে থাকে।
রিলিফ কাজের প্রধানত তিনটি রীতি—হাই-রিলিফ, মিড-রিলিফ এবং লো-রিলিফ। ফরাসি ভাষায় এই শেষোক্ত রীতির নাম—বাস-রিলিফ। এই থেকেই বাংলায় নাম হয়েছে—‘বা-রিলিফ’।
মন্দিরের বেদীতে দেবীর বিগ্রহের একেবারে গা-লাগোয়া করে, ভিন্ন একটি পাথরখণ্ড রাখা আছে। সেটিও প্রাচীন কোন শিল্পকর্মের ভগ্নাংশ বলে আমাদের অনুমান। পরে পরে, দেবীর মূল বিগ্রহের সাথে, নতুন করে অন্য কয়েকটি বিগ্রহেরও সংযোজন হয়েছে, দেখা যায়। যেমন, দেবীর বিগ্রহের একেবারে শীর্ষে ছোট আকারের একটি নারীর মুখোমন্ডল সেঁটে দেওয়া হয়েছে। দেবীমূর্তির ধারণাকে সম্পূর্ণ করবার জন্যই এমনটা হয়েছে বলে মনে হয়।
দেবীর বিগ্রহের বামেও কিম্ভূতদর্শন মুখমণ্ডল সহ দুটি মূর্তি রাখা আছে। ঝাড়গ্রাম জেলার শিলদায় ওড়গোঁদা গ্রামের ভৈরবথানের মূর্তির সাথে, এগুলির সাযুজ্য দেখা যায়। ওড়গোঁদা গ্রামের মতো, পাথরকাটির এই শূণ্য প্রান্তরের দেবস্থলীতে এই মূর্তি বেশ মানানসইও। দেবীর বিগ্রহের একেবারে সামনে পাথরে গড়া প্রমাণ সাইজের একটি শিবলিঙ্গ স্থাপন করা হয়েছে কিছুকাল পূর্বে। সেকারণে, মন্দিরের ভক্ত সমাগমও বেড়েছে।
জয়চণ্ডীর পূজা কে করবেন কতদিন করবেন
এবার আসা যাক দেবীর পূজক বা পুরোহিত প্রসঙ্গে। এখানে পুজককে বলা হয় দেহরি।। পূর্বেই বলা হয়েছে বংশ-পরম্পরায় একজন লোধা পরিবার দেবী জয়চন্ডীর পূজার দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। নারায়ণগড় থানার খেলাড় পরগনার জমিদার সৎপথী বংশ, ইংরেজি ১৮২০ সালে একটি দানপত্র মূলে, তৎকালীন দেহরি খুকুমণি লোধাকে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে কিছু নিষ্কর সম্পত্তি প্রদান করে গিয়েছেন।
এই মন্দিরে পৌরহিত্য করা নিয়ে বিবাদের সূত্রপাত হয় ইংরেজি ১৮৭৭ সালে। এই এলাকা যখন বেলিয়াবেড়ার প্রহরাজ এবং রোহিনীর ষড়ঙ্গী-- এই দুই জমিদারবংশের অধীনে যায়, বিবাদের সূত্রপাত হয় সেসময়। দুই জমিদার বংশই দেবীর মন্দিরে একজন লোধা পূজা করবেন, মেনে নিতে পারেনি।
পাথরকাটির মা জয়চন্ডী।
মাহাতো পদবীর স্থানীয় কুড়মি সম্প্রদায়ের সহযোগিতা নিয়ে, লোধা পূজারির পরিবর্তে, ভরদ্বাজ গোত্রভুক্ত এবং পাহাড়ী পদববীধারী উৎকল শ্রেণীর ব্রাহ্মণ পুরোহিত নিয়োগ করেছিলেন। তাতে বিবাদের সূত্রপাত হয়েছিল। পরে, সেই বিবাদের একটি মীমাংসার ভিত্তিতে স্থির হয়—১. সারা বছর সমস্ত পূজা লোধা পুরোহিত করবেন। ২. শরৎকালে দুর্গোৎসবের সময়, চারদিন দেবীর বিশেষ পুজোয় পৌরহিত করবেন ব্রাহ্মণ পুরোহিত। আর পূজার দিনগুলিতে স্থায়ী দেহরি বলিদান-এর হন্তারক হিসেবে কাজ করবেন। পশুর মাথাটি লোধা দেহরির প্রাপ্য হবে।
সেই বিধান থেকেই ‘এক দেবী দুই পুরোহিত’ রীতির উদ্ভব। অত্যন্ত বিরল এই দৃষ্টান্ত। অন্য কোথাও কোনও মন্দির কিংবা থান নাই, যেখানে এক দেবীর জন্য দুই জাতি সম্প্রদায়ের দুজন পুরোহিত নিযুক্ত আছে।
আরও একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। সেই বিধানের সাথে, আরও একটি বিষয় বলে দেওয়া হয়েছিল। দেবীর মন্দিরে ৪ দিনের পূজাকালে, ব্রাহ্মণ পুরোহিত দেবীর সামনে ভূমিতে আসন পেতে বসবেন। কিন্তু লোধা দেহরি বসবেন তাঁর জন্য নির্দিষ্ট একটি পাথরের উঁচু আসনে। এছাড়াও সারা বছর মন্দিরের দরজার তালা খোলা এবং বন্ধ করবার অধিকারও লোধা দেহরীর হাতেই সমর্পণ করা আছে।
লোধা দেহরি নিজেদের মৌলিক পূজক হিসেবে জ্ঞান করেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বর্তমানে দেখা যায় দেহরিরা ব্রাহ্মণদের মতো উপবিত ধারণ করেন, ‘পুরোহিত দর্পণ’ সংগ্রহ করে রেখেছেন, ব্রাহ্মণ্য-রীতিতে কোষাকুষি- ঘন্টা-প্রদীপ ইত্যাদিও মজুদ করেছেন মন্দিরে। তবে, মন্ত্রতন্ত্র তাঁদের জানা নাই। সব কিছু সাজিয়ে নৈবেদ্য নিবেদন এবং নিজের ভক্তিভাবে পূজা করেন তাঁরা।
মন্দির নিত্যদিন খোলা থাকে। ভক্ত সমাগমও হয়। তবে শনি এবং মঙ্গলবারে ভক্ত সমাগম হয় বেশি। মানতের ছাগল, ভেড়া এবং মহিষ বলি হয় সেই দুটি দিনে।
লোধা কিংবা কূর্মী সম্প্রদায়ের মানুষজনই দেবীর কাছে পূজো নিয়ে আসেন, তা কিন্তু নয়। উচ্চবর্গ নিম্নবর্গ নির্বিশেষে হিন্দু সমাজভুক্ত সকলেই এখানে দেবীকে মান্য করে থাকেন। এমনকি বিস্ময়ের কথা, মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষজনও অন্যের হাতে দেবীর জন্য তাঁদের পুজো পাঠিয়ে দেন।
নিত্যপূজায় বাতাসা দাখিল করা হয় নৈবেদ্য হিসাবে।। কাঁচা দুধ কিংবা চালকুমড়া উৎসর্গ করতেও দেখা যায় কোন কোনও ভক্তকে। কোন কোনও পরিবার আবার তাদের গোয়ালের গরুর প্রথম দুধ, গাছের প্রথম ফল দেবীকে উৎসর্গ করে, তবেই নিজেরা ব্যবহার করেন। কোন কোনও পরিবার এই রীতি চিরকাল অনুসরণ করে আসছে।
পাথরকাটির মা জয়চন্ডী।
দেবীর এই মন্দিরে ভোগদানের পাশাপাশি, ‘ছলন’ হিসাবে পোড়ামাটির হাতি-ঘোড়া উৎসর্গ করা হয় দেবীকে। একারণে, পাথরকাটির জয়চন্ডী যে অনার্য জনের লোকদেবতা, তা প্রমাণ হয় এসব থেকেই।
মন্দিরের বর্তমান দেহরিদের ‘বড় বাবা’ (প্রপিতামহ) ছিলেন কান্ত লোধা। কান্তর ছিল দুই স্ত্রী এবং বারো জন পুত্র ও দুই কন্যা। তাঁদের বংশধররাই দেবীর বর্তমান সেবাইত। রবিবার থেকে মঙ্গলবার বুধবার থেকে শনিবার। দুটি পর্যায়ে পালি ভাগ করে। তবে সকলে পূজার রীতিনীতি জানেন না। বর্তমানে কান্তর দুই প্রপৌত্র-- খগেন লোধা এবং গজেন লোধা মন্দিরে দেহরির কাজ করে থাকেন।
নিত্য পূজার বাইরে, সমস্ত মন্দিরেই বছরে কিছু বিশেষ পূজার আয়োজন দেখা যায়। দেবী চণ্ডীর এই মন্দিরে সম্বৎসরে বড় পূজা দু’বার। প্রথম পূজা দুর্গা পূজার সময় চার দিন এবং দ্বিতীয় পূজা ‘আইখান দিন’ অর্থাৎ পয়লা মাঘ। দুর্গাপূজার সময় প্রথম দুদিন পূজোয় নিরামিষ নৈবেদ্য। নবমী এবং দশমী বলিদান হয়। সেসময় চার-পাঁচ দিনের জমজমাট একটি মেলা বসে, মন্দিরের সামনে বিশাল মাঠ জুড়ে। আইখান দিনেও একদিনের একটি মেলার আয়োজন করা হয় এখানে।
অধিষ্ঠান ভূমির প্রত্নতাত্ত্বিক পরিচিতি
পাথরকাটিতে মা-চারজনদের জয়চন্ডীর এই দেবস্থান এই হিসাবেই পরিচিত। কিন্তু এই হিসাব অর্বাচীন কালের।
ছোট-বড় টিলা ডুংরি পাহাড় জঙ্গল নদী নালা ঝর অধ্যুষিত এই সম্পূর্ণ এলাকা প্রকৃতপক্ষে ছোটনাগপুর মালভূমির প্রলম্বিত প্রান্তদেশ। আদিতে এই সকল এলাকা ছিল অস্ত্রিক ভাষাভাষী অনার্য মানুষদের বাসভূমি। যে কারণে মনুসংহিতা-য় বলা হয়েছে—“অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গিষু পূর্ণ সংস্কারর্মহতী”।
পাথরকাটির মা জয়চন্ডী।
সর্বপ্রথম সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত তাঁর শাসনে নিয়ে আসেন এই সকল দেশকে। এই এলাকায় আর্যদের বসবাস শুরু হয় মৌর্য সম্রাট অশোকের সময়। তার ফলে, সুবর্ণরেখা এবং কংসাবতী (যার পূর্ব নাম ছিল কপিসা) দুই নদীর অববাহিকা জুড়ে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার হতে থাকে। সেকালের তাম্রলিপ্ত, বর্তমান যার নাম তমলুক, সেখানে ছিল বিশালাকার বৌদ্ধবিহার।
কয়েক হাজার শ্রমন অবস্থান করতেন সেখানে। এছাড়াও এই জেলায় আরো কয়েকটি বিহারের উল্লেখ পাওয়া যায় হিউ এন সাঙ-এর বিবরণে।
এই পাথরকাটি গ্রাম যে প্রাচীনকালের বৌদ্ধভূমির অন্তর্ভুক্ত, তারও কয়েকটি প্রমাণ এখানে দাখিল করা যায়। বেশ কিছু প্রত্নবস্তু এই এলাকা থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে। দু-একটির উল্লেখ করা যাক। কারুকার্যময় মুগনি পাথরের একটি ফ্রেম, যাতে বুদ্ধমূর্তি এবং দুটি সর্পের জড়ানো মিথুনমূর্তি খোদিত আছে। এই ফ্রেমটি কলকাতার মিউজিয়ামের সংরক্ষিত আছে। দশটির বেশি কারুকার্য খচিত পাথরের মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। সেগুলি আছে ঝাড়্গ্রাম জেলার বেলিয়াবেড়া জমিদার বাড়িতে।
গ্রানাইট পাথরে খোদিত অবলোকিতেশ্বর-এর একটি মূর্তি এখান থেকেই উদ্ধার হয়েছিল। সেটি স্থানীয় একটি বনেদি পরিবারে রক্ষিত আছে। এছাড়াও, গ্রাম সমীক্ষাকালে গ্রামের অধিবাসীদের বিভিন্ন পরিবারের স্নানের ঘাটে ব্যবহৃত কারুকার্যময় পাথরের খন্ড আমরা দেখেছি, সেগুলি সবই প্রাচীন কোন বৌদ্ধবিহারের অস্তিত্বকে প্রমাণ করতে যথেষ্ট।
জয়চন্ডীর এই মন্দির থেকে সামান্য পূর্বমুখে এগিয়ে জনবসতি। সেখানে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা উঁচু পাড়যুক্ত একটি দীঘি আছে। নাম—‘জলহরি’। দীঘির লাগোয়া একটি বিশাল কূপ আছে। ্তার পাথরের দেওয়ালটি আঠারো ফুট বেড়ের। কূয়াটির পাশেই একটি উঁচু ঢিবি দেখা যায়। স্থানীয় অধিবাসীরা সেটিকে “বিহারের মঠ" নামেই চিনে এসেছেন চিরকাল।
এসবই অতীতকালের কোন বৌদ্ধবিহারেরই ইঙ্গিত বহন করে বলে আমাদের অনুমান। স্থানীয় একটি কুর্মী পরিবার প্রয়াত কমল মাহাতোর বাস্তু ভূমির ভিতরেই, পাথরে খোদাই করা বহু রকমের শিল্পকর্ম ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অনেকে অনুমান করেন, এখান থেকেই কুলটিকরীর রাজা জহর সিং মান্ধাতা বিশাল আকারের আমলক এবং বহু সংখ্যক নিবেদন মন্দির সংগ্রহ করেছিলেন।
আমরা জানি, বুদ্ধদেবের মহাপরিনির্বাণের পর। হীনযান ও মহাযান দুই শাখায় বৌদ্ধরা বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। মহাযানেরও আবার দুটি সম্প্রদায়-- পারমিতা এবং মন্ত্র সম্প্রদায়। শেষোক্ত সম্প্রদায়টি থেকে তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তি হয়। তারা মন্ত্র মুদ্রা ও মন্ডল-এর পত্তন করেছিলেন। এটিই পরে ‘বজ্রযান’ নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। এই সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল বিভিন্ন রকমের ধ্যানধারণা—বিভিন্ন তান্ত্রিক ক্রিয়াবিধি, কতকগুলি গুহ্য যোসাধনা এবং বিভিন্ন প্রকার দেব-দেবীর পূজাআচ্চা।
অনুমান করা হয়, পাথরকাটি গ্রামে বর্তমানে মা জয়চন্ডী হিসেবে যে ভগ্ন দেবীমূর্তিটি পূজিত হয়, সেটি আসলে বজ্রযানী বৌদ্ধদেরই কোন দেবীর প্রতিমা বিশেষ।
M E D I N I K A T H A J O U R N A L
Edited by Arindam Bhowmik
(Published on 21.02.2026)
আলাপচারিতা -
শ্রী ভবতোষ মাহাত, শ্রী শিবতোষ মাহাত, শ্রী ভিক্টর মাহাত, শ্রী খগেন লোধা এবং শ্রী গজেন লোধা—পাথরকাটি।
যেতে চাইলে -
১৬ নম্বর জাতীয় সড়ক মুম্বাই রোড ধরে, যে কোন দিক থেকে গুপ্তমণি আসবেন।। এবার দক্ষিণমুখে পাকারাস্তায় রোহিনী অভিমুখে মাইল পাঁচেক দূরে বাকড়া চক। সেখান থেকে পূর্ব মুখে চার-পাঁচশ’ পা হেঁটে জয়চন্ডী দেবীর মন্দির।
ছবি তুলেছেন -
১. পার্থ দে—তমলুক। ২. চিন্ময় দাশ।
নিচে কমেন্ট বক্সে আপনার মূল্যবান মতামত জানান।