টেরাকোটা, ফলক, নারী, পুরুষতান্ত্রিক, সমাজকাঠামো, সহিংস্রতা, Women, Violence, Patriarchal, Social, Structures, Terracotta, Temples, Medinipur, Midnapore

টেরাকোটা ফলকে নারীঃ পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর সহিংস্রতার এক নীরব প্রাচীন দলিল


Women on Terracotta Plates: A Silent Ancient Document of the Violence of Patriarchal Social Structures



পীযূষ কান্তি সামন্ত



Home » Medinikatha Journal » Pijus Kanti Samanta » টেরাকোটা ফলকে নারী



পশ্চিমবঙ্গের মাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে টেরাকোটা শিল্প - এক অনন্য নির্মাণরীতি যা মন্দিরের স্থাপত্যকে শুধু ধর্মীয় আখ্যানে সীমাবদ্ধ রাখে না, বরং সমসাময়িক সমাজচিত্র ও মূল্যবোধকে তুলে ধরে। এই মন্দিরগুলোর দেওয়ালে খচিত দৃশ্যপট ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও লৌকিক জীবনের পাশাপাশি নারীর অবস্থান, মর্যাদা ও তাঁর প্রতি সহিংস্রতাকেও ব্যক্ত করে। এই টেরাকোটা মন্দিরশিল্পের ফলকগুলির বিশ্লেষণ নারীর প্রতি সমাজের বৈষম্যমূলক ও সহিংস্র মনোভাবকে কখনও সচেতনভাবে, কখনও অচেতনভাবে তুলে ধরেছে।


টেরাকোটা ফলকে নারী, Terracotta, Temples, Medinipur, Midnapore
টেরাকোটা ফলকে চিত্রিত গৃহকর্ম ও পূজার্চনায় সহায়ক হিসেবে নারী।(লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দির, ময়না, প্রতিস্থা কাল- ১৯৫৯, চিত্র গ্রহন- সেপ্টেম্বর, ২০২১)

বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া, হুগলী, বীরভূম, নদীয়া প্রভৃতি জেলার মন্দিরে ব্যবহৃত পোড়ামাটির ফলকগুলি নিপুণ কারুকার্যের নিদর্শন। এই ফলকগুলিতে পৌরাণিক কাহিনী, দৈনন্দিন জীবন, যুদ্ধ, কৃষিকাজ, প্রাণীজগৎ, নৃত্য ও সংগীতের পাশাপাশি নারীর বহুবিধ চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু এই নারীর অবস্থান অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গৌণ—তিনি হয় সেবিকা, কখনও দাসী, কখনও ভোগ্যবস্তু। উদাহরণ স্বরূপ আমরা বিভিন্ন মন্দিরের টেরাকোটা প্যানেলে দেখতে পাই দেব-দেবীর পাশাপাশি নারী বন্দী বা পুরুষদের পদতলে প্রণত, কৌরব সভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, রাম-রাবণের যুদ্ধের প্রেক্ষিতে শূর্পণখার বিকৃত চেহারা ও নাসিকা ছেদন, সীতার অগ্নিপরীক্ষা এবং বনবাসের মূর্ত চিত্র, কিংবা নারী নৃত্যশিল্পীদের শরীরের অতিরঞ্জিত উপস্থাপন। এইসব চিত্র কেবল পৌরাণিক কাহিনীর দৃশ্যরূপ নয়, বরং তা তৎকালীন শিল্পীর, পৃষ্ঠপোষকের ও সমাজের যৌথ দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।


টেরাকোটা শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তার সূক্ষ্ম কারিগরীশৈলী। কিন্তু এই সূক্ষ্মতাই যখন সহিংস্রতাকে অলঙ্কারিক রূপ দেয়, তখন তা সাংস্কৃতিকভাবে ভয়াবহ বার্তা ছড়ায়। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ দৃশ্যের টেরাকোটা চিত্রে তাঁর আত্মরক্ষার আর্তি ও সভার নির্লিপ্ততা, নারীর প্রতি সহিংস্রতা কীভাবে জনসমক্ষে ঘটতে পারে, তার নির্মম বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়। আবার শূর্পণখার নাক কাটা বা সীতার অগ্নিপরীক্ষা দৃশ্যে নারী শরীর ও আত্মার উপর পুরুষ কর্তৃত্বকে শৈল্পীক ন্যায়বিচার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই অলংকরণগুলো দেখে একদিকে শিল্পের মুন্সীয়ানা অনুভব হয়, অন্যদিকে প্রশ্ন উঠে—এই দৃশ্যগুলো নারীর প্রতি সহিংস্রতার সামাজিক স্বীকৃতির দলিল নয় কি?


টেরাকোটা শিল্পে প্রতিফলিত হয় তৎকালীন গ্রামীণ জীবনের নানা দিক যেমন- নৃত্য, গান, কৃষিকাজ, পশুপালন, যুদ্ধ ইত্যাদি। তবে এইসব দৃশ্যেও নারীর ভূমিকা প্রায়শই গৃহকেন্দ্রীক, বিনোদনমূলক অথবা দেহকেন্দ্রীক। পুরুষরা যেখানে যুদ্ধ করে, শিকার করে, রাজনীতি করে; নারীরা সেখানে শুধুমাত্র দর্শক বা অনুসারী। যেমন, মন্দিরের ফলকে দেখা যায় নারীকে কৃষিকাজে সহযোগী হিসেবে নয়, বরং গৃহস্থালির কাজে নিবদ্ধ বা পুরুষদের সেবা করতে ব্যস্ত কিংবা কোথাও নারীকে পশুপ্রেম বা সন্তানের লালনে যুক্ত দেখা গেলেও তা আদর্শ গৃহিণী ভাবমূর্তি থেকে সরে আসে না। এভাবে টেরাকোটা অলংকরণ এক প্রকার পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর দৃশ্য-সংরক্ষণাগার হয়ে ওঠে।



টেরাকোটা মন্দিরগুলো শুধু সামাজিক নয়, ধর্মীয় প্রেক্ষাপটেও নারীকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপন করে। দেবীরূপী নারীর পূজা হলেও মানবী নারীকে শাস্তিযোগ্য, বশযোগ্য, এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, কালী বা দুর্গার যুদ্ধরত রূপ টেরাকোটায় দুর্লভ, অথচ নারী নির্যাতনের দৃশ্য বিশদভাবে উপস্থাপিত। আবার সাধারণ নারী চরিত্রগুলো কখনও শাস্তি পাচ্ছে, কখনও পুরুষ কর্তৃক প্রভাবিত হচ্ছে, কখনও বা ধর্মের স্মরণে এসে উদ্ধার পাচ্ছে। এইসব দৃশ্যপট ধর্মীয় কাহিনীর মোড়কে নারীকে অবদমিত রাখার সাংস্কৃতিক কৌশল হিসেবেও ধরা যায়।


টেরাকোটা অলংকরণ একদিকে সময়ের কাহিনী বলে, অন্যদিকে সমাজের চেতনাকে দৃশ্যমান করে তোলে। মাটির মধ্যে পোড়ানো এই শিল্প আমাদের চোখে সৌন্দর্য, কাহিনী ও ইতিহাসের এক চিত্ররূপ। কিন্তু এই সৌন্দর্যের অন্তরালে রয়ে গেছে নারী শরীরের ব্যবহার, আত্মার অবমাননা ও পুরুষ-শাসিত দৃষ্টিভঙ্গির লিপিবদ্ধতা। আজ যখন আমরা পশ্চিমবঙ্গের টেরাকোটা মন্দিরের কারুকার্য দেখে বিস্মিত হই তখন এই ফলক গুল আমাদের এক কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়ঃ এই কারুকার্য কি কেবল ধর্মীয় শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ, নাকি এক নীরব সহিংস্রতার প্রাচীন দলিল?




M E D I N I K A T H A J O U R N A L

Edited by Arindam Bhowmik

(Published on 22.02.2026)




Please share your valuable feedback in the comment box below.