দাঁতন-মোহনপুরের বিলুপ্তপ্রায় 'সিয়ালগিরি' সম্প্রদায়ের কথা  | Extinct 'Sialgiri' Community of Dantan-Mohanpur

দাঁতন-মোহনপুরের বিলুপ্তপ্রায় 'সিয়ালগিরি' সম্প্রদায়ের কথা | Extinct 'Sialgiri' Community of Dantan-Mohanpur

সন্তু জানা।

শীতল চাটাইয়ের উপর বসে “সিয়ালগির' ভাষা শুনতে শুনতে কখন যে হারিয়ে গেছি অতীত সাম্রাজ্যে, জানি না। কিন্তু বেশ কিছু বিলুপ্তপ্রায় শব্দবাক্য জমিয়ে রাখতে পেরেছি মানসপটে - আমি- "মু" (Mu), আমার- 'মারহী' (Marhi), ছিল “রহী”(Râhin), একে আমি ভালোবাসি- 'ইনহে মু হাউ পাঁই' (Inhamu Kháu Pâi) বাবা-'আগা', (Agâ), তোমাকে - 'হিও' (Khia), তুমি- 'ইন্হে' (Inha), দুঃখ হচ্ছে- 'দয়া বাহি' (Dâya Bahi), তরকারি- 'হাল্ন' (Khalân), ধরে- 'ঝালি' (Jhali), দৌড়চ্ছে- 'লসিন্' (Lâsin), বসে পড়ুন - 'ব্যাইহো পড়' (Baikho Paro), সে যাবে না- 'যাই কো-নী (Jâi ko-ni), একজন রাজা ছিলেন- 'এক রাজা থেই' (Ek Raja Thei) প্রভৃতি।

বর্তমানে, ধর্ম, লোকাচার, রীতিনীতি সমস্ত কিছু আমূল পরিবর্তন ঘটে যাওয়ার ফলে এই উপজাতিকে চেনার একমাত্র পথ ওদের কথাবার্তা, ভাষাগত বিশেষত্ব 'সিয়ালগির' ভাষার কোন লিপি নেই। তাই পুরুষানুক্রমে শুনে শুনেই মনে রাখতে হয়। উচ্চারণের ভিন্নতাও স্পষ্ট। যেমন 'হাউ' (প্রেম) শব্দের উচ্চারণ (Hau) হবে না বা 'Khāu'-ও হবে না, ঠিক দুইয়ের মাঝামাঝি স্বরে উচ্চারিত হবে। ‘Linguistic survey of India’-র পক্ষ থেকে ‘Indo-Aryan Family (vol-ix) গ্রন্থে খান্দেশী, বাঞ্ঝারী, লাভানী, বাহরুপীয়া প্রভৃতি ভীল? ভাষা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে জর্জ গ্রিয়ারসন লিখেছিলেন মেদিনীপুর জেলার দাঁতনে প্রাপ্ত সিয়ালগির” ভাষায় অনুবাদপত্রটি দেখে অনুমিত হয় যে, এটি “ভীল” ভাষারই একটি প্রকারভেদ। “ভীল” সম্প্রদায়ের মানুষেরা মধ্য ভারতের সেন্ট্রাল প্রভিন্স, রাজস্থান ও গুজরাট সীমানায় অবস্থিত মেবারের দক্ষিণপ্রান্তে বসবাস করে৷ যুগ-যুগান্তর ধরে গুজরাটি অপভ্রংশে কথা বলে। এদের ভাষাকে “ভীলি' বলে। এই ভাষার কয়েকটি উপভাষা হল- 'ভীলোরি', 'ভীলবারি', 'লেঙ্গাটিয়া' 'ভীলবলি' প্রভৃতি। একইভাবে, 'সিয়ালগির' ভাষার উৎস এই মধ্যভারতীয় “ভীলি” ভাষা হলেও প্রথমোক্ত ভাষায় বেশ কিছু পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে। যেমন - গুজরাটি ভাষায় “আমি” হল "হু” (hū); “ভীলি” ভাষার আমি” কে বলে 'মো' (Mō)। কিন্তু এই দুইয়ের সঙ্গে সংযোগ রেখে “সিয়ালগির” ভাষায় “আমি” হয়েছে “মু' (Mū)।

দাঁতন-মোহনপুরের বিলুপ্তপ্রায় 'সিয়ালগিরি' সম্প্রদায়ের কথা  | Extinct 'Sialgiri' Community of Dantan-Mohanpur

১৮৯৫ সালে আমেদাবাদে রেভ. সি. এস থমসন “ভীলি” ভাষার ব্যাকরণ ও শব্দভান্ডার রচনা করেন। সেই অনুসারে দেখা যাচ্ছে যে “সিয়ালগির” ভাষায় প্রায় ৬ শতাংশ এমন শব্দও রয়েছে যাদের অস্তিত্ব ভীলি, সাঁওতালী, গুজরাটি, আরবীয়, পার্সী, গোণ্ডী, কোল এমনকী দ্রাবিড়, মুন্ডা, বার্মা-তিববতীয় বা অন্য কোনও আর্য (Aryan) ভাষার শব্দকোষে পরিলক্ষিত করা যায় না, যেমন- “বড়ি থেই” (Badithei বিরুদ্ধে), ‘আগা’ (Aga বাবা), ‘হুম্-বয়া’ (Khām-boyan শুনতে পাওয়া) প্রভৃতি। শব্দগুলি একেবারেই “সিয়ালগির” ভাষার নিজস্ব সম্পদ। হতে পারে, কয়েক শতাব্দী ধরে 'ভীলি” ভাষার যে সব শব্দ হারিয়ে গেছে, সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছেদ হয়ে বহু দূর দেশে বসবাসকারি বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী “সিয়ালগিরি” দের মাঝে তা আজও দেদীপ্যমান। তবু একবিংশ শতাব্দীর এই প্রান্তিক বাংলার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাঁতনে বসে গুটিকয়েক বর্ষীয়ান মানুষ যেন অশ্রুভরা চোখে সেই শেষ প্রহরের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। ভারতবর্ষের ইতিহাস থেকে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলা একটি ভাষার সঙ্গে সঙ্গে যেদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তাদের পূর্বপুরুষের নাম ও নিশান- একটি জাতির জাত্যাভিমান।


midnapore.in

(Published on 15.06.2020)

তথ্যসূত্র :

১. Linguistic Survey of India (vol. IX), Indo-Aryan Family, Part-III, The Bhil Languages, G.A. Grierson, Calcutta, 1907.

২. Journal of the Asiatic Society of Bengal (Note on a Dialect of Gujrati discovered in the district of Midnapore- by G.A. Grierson, Part-I, 1898.

৩. Crystallisation of Caste in Frontier Bengal, Samita Manna, Classical Publishing Company, New Delhi, 2003.

৪. Census of India: (vol. VI), The Provinces of Bengal and their Feudatories, E.A. Gait, 1902.

৫. The people of India, Herbert Risley, Thaeker Spint and Co., 1915.

৬. Bengal Census Report, Part-I, 1901.

৭. Bengal District Gazeteer, Midnapore, L.S.S O’Malley, 1911

৮. মেদিনীপুরের ইতিহাস, যোগেশচন্দ্র বসু, অন্নপূর্ণা প্রকাশনী, ১৪১৬ বঙ্গাব্দ।

৯. মেদিনীপুরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিবর্তন, সম্পাদনা- প্রণব রায়।

১০. মোহনপুর ইতিকথা, শান্তিপদ নন্দ, এগরা, ২০০৩।

১১. www.peoplegroups.org

সাক্ষাৎকার:

১. ভজহরি পাত্র, ত্রিলোচন পাত্র, নিমাই দে।

ক্ষেত্রসমীক্ষা:

১. গ্রাম/নিমপুর-সোলপাট্টা (দাঁতন, পশ্চিম মেদিনীপুর)।

২. গ্রাম/সিয়ালসাই-গোমুন্ডা (মোহনপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর)।

৩.গ্রাম/সুগো-ধান সিমুলিয়া (জলেশ্বর, বালেশ্বর, ওড়িশা)।

৪. বনাঞ্চল/ঝলঝলিবন (মাটিবিরুয়াঁ, বাংলা-ওড়িশা সীমান্ত)।

সহায়তা:

ভাস্করব্রত পতি, শান্তিপদ নন্দ, অরিন্দম ভৌমিক।

প্রথম প্রকাশ:

আনন্দবাজার পত্রিকা। ১০.০৬.২০১৯ এবং ১১.০৬.২০১৯ দুদিন পরপর ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।

আলোকচিত্র :

সন্তু জানা (সম্পাদক : দণ্ডভুক্তি)